অসমিয়া কথাসাহিত্য : একটি পর্যালোচনা

থাসাহিত্যের দুটি প্রধান ভাগ হলো উপন্যাস এবং ছোট গল্প। আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় অসমিয়া উপন্যাস। এখানে একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। অসমিয়া সাহিত্যের একজন অনুবাদক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্ত উপন্যাস আমাকে আলোড়িত করেছে আমি তাদেরই আলোচনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করব। সে হিসেবে এই আলোচনা স্বভাবতই আংশিক,পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নয়। প্রবন্ধের এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব ও নয়।

১৮৭৬ সনে প্রকাশিত হেমচন্দ্র বরুয়ার ‘বাহিরে রং চং ভিতরী কোৱাভাতুরী’কে উপন্যাস রচনার প্রয়াস বলে আমরা ধরে নিতে পারি। আলোচ্য গ্রন্থে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে কিছু অবস্থা এবং পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ১৮৮৪ সনে রচিত পদ্মাবতী দেবী ফুকননীর ‘সুধর্মার উপাখ্যান’কেও উপন্যাস না বলে রোমান্সধর্মী কাহিনি বলাই সঙ্গত। ১৮৯১ সনে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া কলকাতায় ‘বিজুলি’ পত্রিকার সম্পাদক থাকা অবস্থায় ‘ভানুমতী’ উপন্যাস লেখেন। এটি ধারাবাহিকভাবে বিজুলিতে প্রকাশিত হয়। এদিকে ১৮৯১ সনেই ‘জোনাকী’ পত্রিকায় লক্ষ্ণীনাথ বেজবরুয়ার উপন্যাস ‘পদ্মকুমারী’র প্রথম অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তবে ১৯০৮ সনে পুস্তকাকারে প্রকাশিত ‘ভানুমতী’কেই প্রথম অসমিয়া উপন্যাসের মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। উপন্যাসটির বিষয়বস্তু প্রণয়।

১৮৯৫ সনে সুবনশিরি নদীর তীরে বসবাস করা সহজ সরল মিরিদের জীবনকাহিনি নিয়ে ‘মিরি-জীয়রী রচনা করেন। এটিই বরদলৈ্র প্রথম উপন্যাস। জঙ্কি এবং পানেই নামে দুই যুবক-যুবতির প্রণয় কাহিনিই এর প্রধান উপজীব্য।

‘মনোমতী’ বরদলৈ্র ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯০০ সনে প্রকাশিত লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কট এবং বাংলার উপন্যাস সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বারা আলোচ্য উপন্যাস প্রভাবিত। ঐতিহাসিক পটভূমিতে, আংশিকভাবে জনশ্রুতিমূলক কাহিনির আধারে রচিত এই কাল্পনিক ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে একদিকে মানের আক্রমণে বিপর্যস্ত অসমের সমাজজীবনের ছবি, অন্যদিকে দুই সামন্তের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদের শোকাবহ পরিণতির মধ্যে লক্ষ্মীকান্ত এবং মনোমতীর প্রেম বর্ণিত হয়েছে। দন্দুয়াদ্রোহ, নির্মল ভকত, রঙ্গিলী, রহদৈ লিগীরী এবং তাম্রেশ্বরী মন্দির নামে বরদলৈর কয়েকটি উপন্যাস রয়েছে।

রজনীকান্ত বরদলৈর উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল চরিত্র রূপায়ণ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের মতো রজনীকান্ত বরদলৈর উপন্যাস নারী চরিত্র প্রধান। দুই একটি উপন্যাসে পুরুষ চরিত্র কিছু গুরুত্ব পেলেও বেশিরভাগ উপন্যাসেই নারী চরিত্র প্রাধান্য লাভ করেছে। স্যার ওয়াল্টার স্কট এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মতোই বরদলৈ্র উপন্যাস রোমান্স প্রধান। বরদলৈর ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার মূলে ছিল অতীত অসমের গৌরবোজ্জল কাহিনি উদ্ধার করে অসমিয়া জনমানসে প্রাণসঞ্চার করা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সঙ্কটকালীন অবস্থায় অসমিয়া উপন্যাস পূর্ণ পরিণতি লাভ করে। অসমিয়া উপন্যাসকে ভাষা, আঙ্গিক ও চিন্তার গভীরতার দিক দিয়ে উৎকর্ষে নিয়ে যাবার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে বীণা বরুয়া ওরফে বিরিঞ্চি কুমার বরুয়ার। ১৯৪৫ সনে তাঁর রচিত ‘জীবনর বাটত’ (জীবনের পথে) উপন্যাসটিকে কোনো কোনো সমালোচক অসমিয়া সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে চিহ্নিত করে থাকেন। উপন্যাসটিতে কলাকৌশল, বিষয়বস্তুর গভীরতায় লেখকের এমন একটি সাবলীল মনের পরিচয় ফুটে উঠেছে যে বৈচিত্র্যহীন ঘটনার সমাহার হওয়া সত্ত্বেও এটি অসমিয়া সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। উপন্যাসে অতলস্পর্শী, অন্তহীন দুঃখ-বেদনাকেই জীবনের ধর্ম বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রোদ-বৃষ্টি বন্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মতো অর্থহীন।উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র টগরের বিবাহিত জীবনে অভিশাপ রুপে নেমে এসেছে লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা। পুরুষ-প্রধান সমাজের যূপকাষ্ঠে বলি টগর তার জীবনের এই করুণ পরিণতিকে স্বাভাবিক বলেই বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে। কিন্তু রাসনা বরুয়া ছদ্মনামে রচিত লেখকের ‘সেউজি পাতর কাহিনি’ উপন্যাসের চা বাগানের শ্রমিকের গর্ভজাত কন্যা সনিয়া (বাগানের অত্যাচারী ম্যানেজারের ধর্ষণের ফলশ্রুতি) তার ভাগ্যের করুণ পরিণতিকে মেনে না নিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। টগর এবং সনিয়া দু’জনেই দু’ভাবে নির্যাতিতা।

অসমিয়া পাঠক সমাজে কবি নবকান্ত বরুয়া হিসেবেই যাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল তিনি কিন্তু সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন কোনো কাব্যগ্রন্থের জন্য নয়, উপন্যাসের জন্য। ১৯৫৩ সনে শ্রীবরুয়ার বিখ্যাত উপন্যাস ‘কপিলপরীয়া সাধু’প্রকাশিত হয়। এই প্রথম উপন্যাসেই তিনি পাঠক সমাজে যথেষ্ট আলোড়নের সৃষ্টি করেন। শ্রী বরুয়ার বাকি উপন্যাসগুলি হলো: ককা দেউতার হাড়, গরমা কুঁৱরী, মানুহ আটাইবোর দ্বীপ, অপদার্থ ইত্যাদি। পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত লেখকের উপন্যাস রচনার সময়কাল। কপিলী নদীর তীরবর্তী জীবন যাত্রাকে রচিত হয়েছে ‘কপিল পরীয়া সাধু’। মানবীয় প্রেম, সংগ্রাম এবং সংঘাত, ভাগ্য এবং বাস্তবতা মানুষের জীবনে ঘনিয়ে আনা পরিণতি আলোচ্য উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়। উপন্যাসের নায়ক ধীর সিঙের পুত্র রূপাই। পড়াশোনা থেকে তাঁর বেশি আগ্রহ বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপিলী নদীর প্রতি। গরিব পিতা তাকে শহরের বাঙালি উকিলের বাড়িতে রেখে পড়িয়েছিল। কিন্তু দারিদ্র্য রূপাইকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। শহরে থাকার সময় রূপাই স্বরাজ আন্দোলনের সংস্পর্শে আসে। রূপাই আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে যায়। জেলের মধ্যে তিলক গোঁসাইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গোঁসাইয়ের মুখে রূপাই গান্ধীজির সত্যাগ্রহের কথা, অহিংসা নীতির কথা শুনে। জেল থেকে ফিরে রূপাই গ্রামের স্কুলের উন্নতির দিকে নজর দেয়। বন্যা নিপীড়িত লোকদের সাহায্য করতে বেরিয়ে রূপাই প্রবল বন্যায় ভেসে যাওয়া সোনপাহীকে উদ্ধার করে। এই সোণপাহী রূপাইয়ের জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। রূপাই প্রকৃতপক্ষে ধীর সিংহের ছেলে নয়। কপিলী নদীর তীর থেকে তাকে কুড়িয়া আনা হয়েছিল। এই রহস্য এতদিন রূপাইয়ের কাছে অজ্ঞাত ছিল। ধীর সিঙের মৃত্যুর পরেই রূপাই প্রথম তাঁর জন্ম-রহস্য জানতে পারে। এই অজ্ঞাত রহস্য রূপাইকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। সে কপিলীর বুকে আত্মাহুতি দিতে যায়। কপিলী যেন তাঁর মা, রূপাইকে গ্রহণ করে না, ফিরিয়ে দেয়। স্রোতে ভেসে যাওয়া রূপাইকে উদ্ধার করে সোণপাহীর পরিবার। সোনপাহী এবং তাঁর পিতার সেবা শুশ্রূষায়রূপাই সুস্থ হয়ে পুনরায় ধীর সিঙের ঘরে ফিরে যায়। রূপাই সোনপাহীর প্রেমকে অস্বীকার করেনি। তবে সে তার প্রেমকে দৈনন্দিন জীবনের মাঝখানে এনে সীমায়িত করতে চায় না। একদিন সোনপাহী কপিলীর বুকে চিরতরে হারিয়ে যায়। ‘কপিলপরীয়া সাধু’ নদীভিত্তিক আঞ্চলিক উপন্যাস। কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কপিলী নদীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। মনে হয় কপিলী যেন এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—যে চরিত্র, কাহিনি এবং নায়কের সঙ্গে আরও কয়েকটি চরিত্রেরও নিয়ামক। উপন্যাসের শুরু হয়েছে কপিলীর রঙ ও রূপের কাব্যিক বর্ণনায়। উপন্যাসের বিভিন্ন অংশে আমরা ঔপন্যাসিকের আড়ালে কবি নবকান্ত বরুয়াকে খুঁজে পাই।

১৯৬০ সনে প্রকাশিত বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যের ‘ইয়ারুইঙ্গম’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু নাগাবিদ্রোহ। ইয়ারুইঙ্গম শব্দের অর্থ জনসাধারণের শাসন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের করালগ্রাস নাগাদের সামাজিক ও আর্থিক জীবন বিপর্যস্ত করে এক অন্ধকার ও অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। কোহিমা থেকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত জাপানী সৈন্যরা চলে যেতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের এই শেষ পরিণতি থেকেই উপন্যাসের কাহিনি শুরু হয়েছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন সৈনিক ভিডশেলী আজন্ম যোদ্ধা নাগাজাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছে। ব্রিটিশরা চলে যাবার পরে ভিডশেলী নাগাদের জন্য স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি তুলে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামচালিয়ে যায়। অপরদিকে যীশুর প্রেম ও মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার আদর্শে রিশাঙ এক নতুন সমাজ গড়ে তুলতে চায়। আলোচ্য উপন্যাস আমাদের প্রফুল্ল রায়ের ‘পূর্ব পার্বতী’র কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

লেখকের ‘মৃত্যঞ্জয়’ ১৯৭০ সনে প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সনের আগস্ট বিপ্লব এর পটভূমি। বাস্তব কিছু চরিত্রের আধারে কল্পনার রঙ মিশিয়ে লেখক উপন্যাসটি গড়ে তুলেছেন। হিংসা এবং অহিংসার দ্বন্দ্ব উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় বিষয়। সহিংস বিপ্লবে যোগ দিলেও গোঁসাই, ভিডিরাম, মধু এই অর্ন্তদ্বন্দ্ব থেকে রেহাই পায়নি। রেল উল্টে শত্রুপক্ষের শত শত সৈন্য নিহত হয়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মহদা গোঁসাই সঙ্গী সাথিদের মিলিটারির গাড়ি উল্টে সরকারি অত্যাচারেরর বদলা নিতে উৎসাহিত করেছে। অবচেতন মনে তার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—‘মানুষ না মরে যদি যুদ্ধ করতে পারত, তাহলে কতই না সুন্দর হত।’ স্বাধীনতার যুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে গোঁসাইনী চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করেছে—‘স্বাধীনতা পেলে মানুষগুলি সৎ হয়ে উঠবে কি? কাটাকাটি মারামারি করা ছেড়ে দেবে তো?’ উপন্যাসের শেষে এভাবেই জীবন এবং শান্তির প্রতি থাকা মানুষের সুস্থ এবং স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে।

১৯৬৭ সনে হোমেন বরগোহাঞির ‘মৎস্যগন্ধা’ রচিত হয়। উপন্যাসটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও বরগোহাঞির প্রতিভার বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর হিসেবেই শুধু নয় অসমিয়া উপন্যাসে সমাজ বাস্তবতার উজ্জল নিদর্শন হিসেবেও বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সমাজে প্রচলিত জাতিভেদের সমস্যাকে কেন্দ্র করে এর কাহিনি গড়ে উঠেছে। অসমের সুদূর গ্রামে গঞ্জে এখনও জাতিভেদের কুৎসিত ব্যাধি বর্তমান লেখক তারই ছবি নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মেনকা জাতিতে ডোম। উচ্চবর্ণের লোকদের শুচিবায়ুগ্রস্ততা পদে পদে তথাকথিত নিম্নবর্ণের লোকদের উপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ মেনকাকে সমস্ত হিন্দুদের প্রতিই বিদ্রোহী করে তোলে। উপন্যাসের শেষে আমরা দেখি মেনকার বহুদিনের প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ হয়েছে। ভাষার বলিষ্ঠতার সঙ্গে ধ্বনিমাধুর্য ও কল্পচিত্র যুক্ত হওয়ায় উপন্যাসটি একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে।

‘হালধীয়া চরায়ে্ বাওধান খায়’ (১৯৭৩) শীর্ষক উপন্যাসটি হোমেন বরগোহাঞির সামাজিক উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসের নায়ক রসেশ্বর সাতটি ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। তার সম্বলের মধ্যে এক টুকরো ছিল। একদিন সকালবেলা রসেশ্বর যখন মাঠে চাষ করছে, তখন সেখানে আকস্মিকভাবে উপস্থিত হয় গ্রামের সবচেয়ে ধনী ঠিকাদার সনাতন শর্মা। সনাতনের মতো চতুর এবং ধুরন্ধর লোককে দেখে রসেশ্বর প্রমাদ গোণে। কিছুক্ষণের তার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়। সে অবাক হয়ে শোনে এতদিন ধরে যে জমি চাষ করছে তার মালিক নাকি সনাতন শর্মা। তারপর শুরু হয় সেই চিরন্তন ইতিহাস। ধনীর রুদ্ধ দুয়ারে রসেশ্বর মাথা কুটে মরে। নিরুপায় হয়ে রসেশ্বর মামলা করে। ডিম্বেশ্বর মণ্ডলের কাছে মামলা সংক্রান্ত পরামর্শ চাইলে ডিম্বেশ্বর তাকে মিথ্যা আশ্বাস দেয় আর ভেতরে ভেতরে রসেশ্বরকে সর্বস্বান্ত করার নতুন নতুন ফন্দি ফিকির বের করে। সরকারি আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপশাসনের যে বীজ গোটা সাস্ন ব্যবস্থাকে অন্যায় অবিচারের পীঠস্থান করে তুলেছে তা তিনি চাকরি সূত্রে নিজের চোখে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলোও তাই এত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রসেশ্বরের কাহিনি আমাদের সহজেই রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমির’ উপেন এবং গোগোলের ‘ওভারকোট’ গল্পের আকাকি বাশমাচকিনকে মনে করিয়ে দেয়।

১৯৮৭ সনে রচিতহোমেন বরগোহাঞির ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ উপন্যাসটি শিশু মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অজ্ঞানতা ও অন্ধকারে ঘেরা এক গ্রামের একটি অবোধ শিশুর নাগরিক জীবনে প্রবেশ লাভ এবং ইংরেজি শিক্ষার সংস্পর্শে এসে এক নতুন আনন্দময় জগতের সন্ধান অত্যন্ত মনোরম ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। বিক্রম ওরফে বাপুকণ এর মুখ্য চরিত্র। বাপুকণ এবং তাঁর বন্ধু হেবাঙ এই দুই বালকের নিত্য নতুন দুষ্টুমিতে ভরা জীবন আমাদের শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। লেখকের অত্যন্ত প্রিয় বিষয় মৃত্যুচেতনা এবং প্রকৃতির প্রতি নিবিড় ভালোবাসা উপন্যাসটিকে একটা বিশিষ্টতা দান করেছে। বাপুকণ আর রেণুর কিশোর প্রেম আমাদের ‘পথের পাঁচালী’র অপু-লীলার প্রেমের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাংলা সাহিত্যে আশাপূর্ণা দেবী তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে যেভাবে নারী জীবনের ব্যথা বেদনা ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেছেন, অসমিয়া সাহিত্যেও তেমনই কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের হাতে নারী জীবনের বেদনাঘন ইতিহাস ফুটে উঠেছে। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে প্রথমেই নিরুপমা বরগোহাঞির নাম করতে হয়। ১৯৯৬ সনে লেখকের ‘অভিযাত্রী’ উপন্যাসটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘ইপারর ঘর সিপারর ঘর’ এবং ‘অন্যজীবন’ এই ত্রয়ী উপন্যাসে লেখিকার নারী চিন্তার বিবর্তনের একটি আভাস পাওয়া যায়।

‘অভিযাত্রী’ উপন্যাসটির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানীর ঘটনাবহুল জীবনকে কেন্দ্র করে আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনি গড়ে উঠেছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে চদ্রপ্রভা শইকীয়ানী এক উজ্জ্বল জ্য্যোতিষ্ক। উপন্যাসের মধ্যে লেখিকা চন্দ্রপ্রভা দেবীর কংগ্রেসে যোগদান, অসমে মহিলা সমিতি গঠন এবং তার বিকাশ দেখানো হয়েছে। শৈশব থেকেই চন্দ্রপ্রভা ছিলেন নারীর অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। নারী যে পুরুষ থেকে কোনো অংশেই হীন নয় এই ধারণাই চন্দ্রপ্রভাকে সারাজীবন প্রতিবাদী চরিত্র করে তুলেছে।

১৯৮৭ সনে রচিত নিরুপমা বরগোহাঞির ‘গোহাঁনী আই গোসাঁনী আই’ উত্তর কামরূপের পটভূমিতে অসম আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। আলোচ্য উপন্যাসে অসম আন্দোলন সম্পর্কে ব্যক্তিগত ধ্যান ধারণা প্রতিফলিত হওয়ায় এর একটি সামাজিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। অসম আন্দোলনের শুধুমাত্র অমানবিক দিকটার ছবিই নয়, ভুলপথে পরিচালিত এই আন্দোলন যে দীর্ঘকাল ধরে অসমে বসবাস করে আসা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করবে সে বিষয়েও তিনি সবাইকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। উপন্যাসের শেষে ধ্বনিত হয়েছে প্রচণ্ড আশাবাদ। শ্রীমতী গোস্বামীর তীব্র মানবিকতা বোধে আপ্লুত হয়ে তারই কন্যা রূনী মাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দিত স্বরে বলেছে—‘মা, মা তুমি সত্যই মা, হলধরের মা, রজব আলীর মা—পৃথিবীর সমস্ত সন্তানেরই মা।’ এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের সমাপ্তি অংশেরই প্রতিধ্বনি যেখানে আমরা দেখি গোরা ও আনন্দময়ীর মধ্যে সমস্ত ভারতবর্ষকে আবিষ্কার করেছে।

জ্ঞানপীঠ পুরস্কার বিজয়িনী ইন্দিরা গোস্বামী ওরফে মামণি রয়সম গোস্বামীর উপন্যাসেও নারী জীবনের দুঃখ বেদনার ইতিহাস প্রাধান্য লাভ করেছে। ‘নীলকণ্ঠী ব্রজ’ উপন্যাসে হিন্দুর অকাল বিধবা সৌদামিনী পরম্পরাগত সমাজের ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। বিধবা বিবাহ আইনত কার্যকরী হলেও নারীকে বিধবার কঠোর জীবন যাপনে বাধ্য করা হয়ে থাকে। সৌদামিনীর একজন খৃষ্টান যুবককে ভালোবাসার ঘটনা রক্ষণশীল পরিবারকে চিন্তিত করে তোলে। ধর্মীয় প্রভাবের দ্বারা সৌদামিনীর মনের পরিবর্তন আনার জন্য তাকে হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বৃন্দাবনে এসে সৌদামিনী রাধেশ্যামীদের সঙ্গে পরিচিত হয়। দারিদ্রের তীব্র জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এইসব বাল্যবিধবা রাধেশ্যামীদের অনেকেই যৌন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। অন্যান্যদের মতো সৌদামিনী রাধেশ্যামীদের কদর্যজীবনকে মেনে নিতে পারেনি। তাই সে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সমাজের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহকে রক্ষনশীলরা মেনে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত সৌদামিনী আত্মহত্যা করে সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

‘দঁতাল হাতীর উয়ে খাওয়া হায়দা’ উপন্যাসে মামণি রয়সম গোস্বামী উচ্চবর্ণের বাল্যবিধবার সমস্যাকে তুলে ধরেছেন। কমবয়সী বিধবা গিরিবালা বিধবার বসন পরলেও ব্রাহ্মণের বিধবার কঠার নিয়মাবলীকে মেনে নিতে পারেনি। মার্ক সাহেবের সান্নিধ্যে এসে গিরিবালা এক নতুন জগতের সন্ধান লাভ করে। আর দশটি মেয়ের মতো গিরিবালা ধর্মভীরু আর অবস্থার দাস হতে অস্বীকার করে। নিজের দেহের অতৃপ্ত কামনা বাসনাকে সে দমন করে রাখতে পারেনি। মার্ক সাহেবকে ভালোবেসে সে নতুনভাবে বাঁচতে চায়। তবে মার্ক সাহেব শেষ পর্যন্ত গিরিবালার প্রেমকে স্বাগত জানানোর মতো সাহস অর্জন করতে না পেরে পালিয়ে যায়। ম্লেচ্ছ সাহেবের সঙ্গে মধ্যরাত পর্যন্ত কাটানোর প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ প্রতীকী দাহ মানতে গিয়ে গিরিবালা আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করে। গিরিবালার এই আত্মহত্যার ঘটনায় সমাজের প্রতি তার ক্ষোভ, প্রেমিকের প্রতি অভিমান এবং বিশেষ করে বিধবা নারীর উপর সমাজ চালানো কঠোর শাসনের প্রতি বিদ্রোহের মনোভাব ফুটে উঠেছে।

১৯৮৪ সনের দিল্লি রায়টের নৃশংস ঘটনা নিয়ে ইন্দিরা গোস্বামী ‘তেজ আরু ধূলিরে ধূসরিত পৃষ্ঠা’ রচনা করেন। আলোচ্য উপন্যাসের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের সূচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘পরবাস’ উপন্যাসের কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ইন্দিরা গোস্বামীর উপন্যাসে বিভীষিকার নগ্ন রূপ আমাদের মনে যেমন আতঙ্কের সৃষ্টি করে তেমনই সূচিত্রা ভট্টাচার্যের উপন্যাস আমাদের অস্তিত্বের শিকড়কে নাড়িয়ে দেয়

অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতার ‘অয়নান্ত’ উপন্যাসে সামাজিক ইতিহাস এবং নারীর ব্যক্তিগতমুক্তি চেতনার সামান্তরাল দুটি ধারার মধ্য দিয়ে নিপীড়িত সত্ত্বার মর্মবেদনা ফুটে উঠেছে। ‘ফেলানী’ অসম আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত একটি দুঃসাহসিক উপন্যাস। অভিশপ্ত সময়ের পটভূমিতে দুঃখ-দুর্দশায় জড়িত সাধারণ মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের চিত্রায়ণে মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে এই উপন্যাস। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা যেন সেই ভয়াবহ-রক্তাক্ত দিনগুলিতে ফিরে গেছি। চারদিকে ক্ষমতা দখলের লড়াই, মিলিটারির অত্যাচার, জনগণের আশাভঙ্গের বেদনা আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে যায়। তথ্যের প্রতি লেখকের সততা, সর্বোপরি এক অপূর্ব নির্মোহ দৃষ্টি আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে। 

উপযুক্ত পরিসরের অভাবে আরও অনেক উপন্যাসের আলোচনা করা গেল না। পূরবী বরমুদৈর ‘শান্তনু কুলনন্দন’,’বাঘশাল, বাঘজাল আরু মানুহ’,’গজরাজ প্রেম আরু বন্দিত্ব’, ধ্রূবজ্যোতি বরার ‘কালান্তরর গদ্য’, কথা রত্নাকর’, দিলীপ বরার ‘কলিজার আই’, অসমিয়া উপন্যাসকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। আমার এই আলোচনা যদি বাংলা ভাষার পাঠক পাঠিকাদের অসমিয়া সাহিত্য সম্পর্কে কিছুমাত্র আগ্রহী করে তোলে তাহলে এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।

লেখক পরিচিতি

বাসুদেব দাস
১৯৫৮ সালে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে জন্ম। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম.এ। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে অনুবাদের কাজে রত। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুবাদ এবং সাহিত্য সংক্রান্ত আলোচনা চক্রে গবেষণাপত্র পাঠ। আজ পর্যন্ত ৪৫০-এর বেশি অসমিয়া গল্প, প্রচুর কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত