আর্তুর র‍্যাঁবো | মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

কবি আর্তুর র‍্যাঁবোর নাম শোনেনি বা তাঁর কবিতা পড়েনি এমন কবির সংখ্যা সারা বিশ্বে শূন্যই বলা চলে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কবিতার দেশে র‍্যাঁবো আজও  প্রবলভাবে সমাদৃত। এখনো এদেশের সাহিত্য সমাজে তাঁর পরিচিতি, প্রভাব যথেষ্ট।  কবিতা মানে যদি বিদ্রোহ, প্রেম, অনিয়মের শৃঙ্খল ভাঙার অমিত প্রত্যয় কিংবা সৃষ্টি সুখের উল্লাস হয়ে হয়ে থাকে, তাহলে র‍্যাঁবোর কাছে যেতেই হয়। পাঠ গ্রহণ করতে হয় তাঁর সৃষ্টির সম্ভার থেকে। এতো কম বয়সে, এতো কম সময়ে সাহিত্যাঙ্গনে এতো বেশি অবদান রাখবার সুযোগ আর কোনো কবির পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি। লিখেছেনও খুব সামান্য। সাকুল্যে শ-খানেক কবিতার সাতখানা গ্রন্থই তাঁর সম্বল। এক্ষেত্রে আমাদের উপমহাদেশের সুকান্ত একমাত্র ব্যতিক্রম বলে বিবেচ্য হতে পারে। বয়সের বিবেচনায় আর কেউ তাঁর সঙ্গে তুলনীয় নয়। র‍্যাঁবোর পুরো নাম জাঁ নিকোলাস আর্তুর র‍্যাঁবো। জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ২০ অক্টোবর ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি দেশের উত্তর পূর্ব সীমান্ত এলাকার আরডেনস্ এর শার্লভিলে। কিশোর বয়সেই তিনি তার সৃষ্টিশীলতার শ্রেষ্ঠ নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়ে ভিক্টর হুগো তাঁকে ‘একজন নাবালক শেকসপিয়র’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। জরাজীর্ণ সমাজের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলকে চাঙ্গা করেছিলেন বালক কবি র‍্যাঁবো। পরবর্তী সময়ে তাঁর চিন্তা-চেতনা আধুনিক সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং পরাবাস্তবতার ওপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছিল। সমস্ত ফরাসি জাতিকে ঝাঁকুনি দিয়ে এই অস্থির চিত্তের বালক মাত্র বিশ বছর বয়সে সাহিত্য জগতকে ‘গুডবাই’ জানান।  মৃত্যুমুখেও পতিত হয়েছিলেন পরিণত বয়সের অনেক আগে। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। জীবিতকালে সমসাময়িক কবি সাহিত্যিকদের কাছে তিনি হেয়প্রতিপন্ন হলেও মৃত্যুর অনতিকাল পরেই চলে আসেন লাইম লাইটে। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে শুরু হয় বিস্তর গবেষণা। প্রতীকী কবিদের পথিকৃৎ হিসেবে সকলের কাছে হয়ে ওঠেন সমাদৃত। হয়ে ওঠেন কবিতার দেবদূত, কবিতার দেবতা।

মুখ্যত কবি আর্তুর র‍্যাঁবো ছিলেন এক বিরল প্রতিভার অধিকারি। তিনি শুধু ফরাসি দেশেই নয় পুরো ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কবিতায় যুক্ত করেছিলেন নতুন মাত্রা। পরিতাপের বিষয় জীবদ্দশায় র‍্যাঁবোর দিকে কেউ ফিরেও তাকাননি। ‘নরকের এক ঋতু’ প্রকাশিত হয়েছিল ব্রাসেলস থেকে। মা’য়ের কাছে কিছু অর্থ-কড়ি নিয়ে বড় আশা করে তিনি বইটি ছাপিয়েছিলেন। বইটির সাফল্যের ব্যাপারে র‍্যাঁবোর হৃদয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। শোনা যায়; তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, এই বইটির ওপরই নির্ভর করছে তাঁর ভাগ্য। এ কাব্যগ্রন্থের কিছু কপি তিনি ডাক যোগে প্যারিসের কবি, সাহিত্যিক এবং পত্রিকাঅলাদের কাছে মূল্যায়নের নিমিত্ত পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর এ বিষয়ক প্রতিক্রিয়া জানার জন্য র‍্যাঁবো প্যারিতে পদার্পন করলে কারও তরফ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাননি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউই এ ব্যাপারে উৎসাহতো প্রকাশ করেনইনি, উপরোন্ত কেউ কেউ বইটি উল্টেপাল্টে পাগলামি, ইয়ার্কি ফাজলামি, কবিত্ববর্জিত কবিতা বলে বিরূপ মন্তব্য করতেও কার্পণ্য করেনি।  কোনো পত্রিকাঅলাও কোনো রিভিউ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। এহেন হতাশাজনক বাস্তবতা র‍্যাঁবোকে খুবই আহত করেছিল। একবুক অভিমান নিয়ে প্যারির পথে কয়েকদিন বিমর্ষ হয়ে ঘোরাফিরা শেষে ১৮৭৩ সালে ভগ্ন হৃদয়ের কবি পদব্রজে প্যারিস থেকে শার্লভিলে গিয়ে তাঁর সমগ্র কবিতা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর পর আর কখনও কবিতার দিকে ফিরেও তাকাননি অভিমানি কবি।

 

যে কবি তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনে কবিতার স্বার্থে অনেক কাজেই নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন; যিনি একাধারে ছিলেন ভিক্ষুক, হকার, ছিঁচকে চোর, দিন মজুর, শিক্ষক, ভবঘুরে। কবিতার প্রয়োজনে পথে পথে ঘুমিয়েছেন, জীবিকার প্রয়োজনে, ভালো লাগার স্বার্থে যখন যা করতে ইচ্ছে হয়েছে তা-ই করেছেন নিঃশঙ্ক চিত্তে। সেই কবি মাত্র বিশ বছর বয়সে হঠাৎ করে কেন কাব্য জগত থেকে বিদায় নিলেন, কবিতার প্রতি কেন এতোটা বিরূপ হলেন, তা এক হেভি ওয়েট প্রশ্নই বটে। কবি কুলের অবহেলা বা প্রবঞ্চক সমাজের প্রতি চরম ঘৃণাই কী তাঁকে কলম ছাড়তে বাধ্য করেছিল? নাকি এ অস্থির জীবন তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল? এসব প্রশ্নের আজও কোনো সদুত্তর মেলেনি। কেউ কেউ বলে থাকেন সেদিন যদি ‘নরকের এক ঋতু’র ব্যাপারে প্যারির কবিরা সঠিক মূল্যায়ন করতো, যথাযথ আগ্রহ দেখাতো, তাহলে হয়তো পৃথিবী পেত অন্যরকম এক র‍্যাঁবোকে। তাঁর পক্ষে অর্থের অভাবে প্রেস থেকে অবশিষ্ট বইগুলোও সে সময় গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর দশ বছর পরে ১৯০১ সালে বইগুলো প্রেসের গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। মৃত্যুর পরে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় মাতামাতি। রক্ষণশীলদের দেয়াল ভেদ করে র‍্যাঁবো হয়ে ওঠেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। চারিদিকে তাঁকে নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এক-এক জন একেক ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন। আঁদ্রে বে্রঁতোর তাঁকে বলেছেন, ‘কৈশোরের মূর্তিমান দেবতা’। আলবেয়ার কামু তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, বিদ্রোহের কবি’। রেনে শাঁ বলেছেন, ‘যে সভ্যতা জন্মায়নি তখনো, তার প্রথম কবি র‍্যাঁবো’। জ্যাঁক রিভিয়েরের বিবেচনায় র‍্যাঁবো হলেন, ‘একটা বজ্জাত এবং ভয়ঙ্কর শিশুর শরীরের ভেতর সব চাইতে উঁচু মার্গের একটা চেতনা ও চৈতণ্যের আবাস’। পল ভ্যালেরি র‍্যাঁবোর কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘পরিচিত কবিতাগুলো লিখার সময় বরাবরই সাধারণ ভাষা ব্যবহার করা হয় কিন্তু এক্ষেত্রে র‍্যাঁবো ব্যতিক্রম’। তাঁর সম্পর্কে লোকনাথ ভট্টাচার্য বলেন, ‘তাঁর জীবন সম্পর্কে সমস্ত প্রহেলিকার সমাধান আজও হয়নি। আর কাব্য সম্বন্ধে যে প্রহেলিকা-পনেরো থেকে উনিশ বছর পর্যন্ত যে ছেলে কবিতা লিখেছিল , সে কী করে এই রকম কবিতা লিখতে পারলো সে প্রহেলিকার কখনো সমাধান হবে না’। ভুমেন্দ্র গুহ তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘র‍্যাঁবো স্বতন্ত্র, বিশালভাবে স্বতন্ত্র, আজও তাঁর পূর্বসূরি নেই উত্তরসূরিও না’।

 

র‌্যাবোর চিন্তা-চেতনা-জীবনধারাকে উপজীব্য করে পরবর্তী সময়ে বিকশিত হয় দাদাইজম। ত্রিস্তান জারা নামের এক রোমানিয়ান যুবক জুরিখের ‘ভলতেয়ার ক্যাবারে’ বন্ধুবান্ধবসহ আড্ডায় মশগুল থাকতো। প্রথম যুদ্ধোত্তর ইউরোপের ধবংসস্তুপের অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি লাভের পথ সন্ধানে তারা ছিল অস্থির, উদগ্রীব। ধবংসস্তুপের উদরে তারা ফোটাতে চেয়েছিল ফুলের সুঘ্রাণ। প্রচণ্ড উচ্ছৃঙ্খল ও অস্থির চিত্তের ত্রিস্তান জারা কয়েকজন সতীর্থের সমন্বয়ে তাদের কাঙ্খিত অভীষ্ঠে পৌঁছার লক্ষ্যে গড়ে তোলে এক সাহিত্য সমিতি। এই সাহিত্য সমিতির নাম দেয়া হয় ‘হৈ চৈ সমিতি’। এ সমিতির সদস্যরা কোনো নিয়ম নীতি, ব্যাকারণ, ছন্দের তোয়াক্কা না করে কবিতা লেখায় নেমে পড়ে। সারা ইউরোপে এরা একটা যোগাযোগ নেট ওয়ার্ক গড়ে তোলে। এবং এক পর্যায়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে নিজেদের মতবাদ ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশে জুরিখের পাট চুকিয়ে প্যারিতে এসে আখড়া গাড়ে। এ সমিতির সদস্যদের দেয়া ‘দাদা’ নাম থেকেই পরবর্তীতে অঙ্কুরিত হয় দাদাইজম বা দাদাবাদ। এরা ছিল অনেকটা প্রবীণ বিদ্বেষী। নব আঙ্গিকে নতুনদের নিয়েই আবর্তিত হতো এদের সাহিত্যের ক্রিয়াকর্ম। এরা রাস্তাঘাটে, বাসে ট্রামে, যত্রতত্র কবিতা নিয়ে মাতামাতি করতো। গতানুগতিকতার বাইরের এসব কর্মকাণ্ডকেই তারা যথার্থ কর্মদ্যোগ বলে মনে করতো। শেকড়হীন জীবনই ছিল এদের কাছে স্বাভাবিক জীবন। উন্মেষের সূচনাকালে বেশ সাড়া জাগাতে পারলেও এ আন্দোলন খুব বেশিদূর এগুতে পারেনি। অচিরেই আঁদ্রে বে্রঁতোর সুররিয়ালিজমের প্রভাবে দাদাইজম স্তিমিত হয়ে পড়ে। দাদাইজম, সুররিয়ারিয়াজম উন্মেষের পেছনো ছিল আর্তুর র‍্যাঁবোর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব। একই ধারাবাহিকতায় শুরু হযেছিল হ্যাংরি মুভমেন্ট। বলা বাহুল্য এদেশের কবিতা জগতে তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন বিকশিত না হলেও অনেকেই র‍্যাঁবোর ভাবধারার প্রভাবে নিজেদের একটি বলয় গড়ে তুলেছিলেন এবং সার্থকতার সাথে কবিতা চর্চায় নিজেদের নিমগ্ন ছিলেন। নির্মলেন্দু গুণ’, রফিক আজাদ কিংবা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে এ ঘরানার কবি হিসেবে নিঃসন্দেহে বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

১৯৭১ এর নভেম্বর মাসে কবি পাবলো নেরুদা স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় আর্তুর র‍্যাঁবোকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘ঠিক শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলো, তখন এক দুর্ভাগা অথচ আলোকিত কবি, ভাগ্য তাড়িতদের মধ্যেও সর্বাধিক যন্ত্রণাক্লিষ্ট, ভবিষ্যত বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, ‘ভোরবেলায় অপরূপ নগরে গিয়ে আমরা পৌঁছুব, জলন্ত সহিষ্ণুতা বুকে নিয়ে’। সত্য দ্রষ্টা র‍্যাঁবোর এই ভবিষ্যত বাণী আমি বিশ্বাস করি। … সবশেষে, আমি শুভার্থী সকল মানুষকে, শ্রমিকদের, কবিদের উদ্দেশে বলতে চাই যে, র‍্যাঁবোর ঐ বাক্যে মানুষের ভবিষ্যত উচ্চারিত হয়েছে।’ পাবলো যথার্থই বলেছিলেন। পৃথিবীর অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা আজও জলন্ত সহিষ্ণুতা বুকে নিয়ে প্রত্যাশিত অপরূপ নগরে ভোরবেলায় পোঁছানোর অপেক্ষায় এখনো কালাতিপাত করছে। সে কারণেই আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় আর্তুর র‍্যাঁবোর কাছে এবং এ কারণেই র‍্যাঁবোকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনো চলছে হরদম লেখালেখি। আজ একবিংশ শতাব্দীতেও তাঁর আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। র‍্যাঁবোর মৃত্যুর পর থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত কয়েকশো বই এবং প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এরমধ্যে জীবনী গ্রন্থই লেখা হয়েছে প্রায় ডজন খানেক। দু-হাজার সাল অবধি বৈশ্বিক পর্যায়ে তাঁকে নিয়ে প্রতি বছর গড়ে দশটা বই এবং সাতাশিটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১২ সালে ইসাবেলার স্বামী পাতেরনে প্রথম র‍্যাঁবোর সমগ্র রচনা প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় চার্লস নিকোলাসের Somebody else: Arthur Rimbaud in Africa ১৮৮০-৯১। ১৯৯৮ সালে অ্যাবসলিউট প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় বেঞ্জামিন Arthur Rimbaud—১৯৮১ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় সেসিল আর্থার হ্যাকেটের, Rimbaud: A Critical Introduction—১৯৭৩ সালে ফেবার অ্যান্ড ফেবার থেকে প্রকাশিত হয় এনিড স্টার্কির Arthur Rimbaud—১৯৭১ সালে হ্যাস্কেল হাউস পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় এজেল রিকওয়ার্ডের Rimbaud: The Boy and The poet—১৯৬৩ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ডব্লু এম ফ্রহকের Rimbaud’s Poetic Practice: Imag and Theme in The Major Poems—১৯৬২ সালে নিউ ডিরেকশন থেকে প্রকাশিত হয় এনিড স্টার্কির Arthur Rimbaud: A Biography—২০১১ সালে এডিশন ডিডিয়ার মিলেট থেকে প্রকাশিত হয় জেমি জেমস এর Rimbaud in Java: The Lost Voyage—২০০৯ সালে অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত হয় মার্টিন সরেল সম্পাদিত Arthur Rimbaud: Collected Poems—২০০৫ সালে প্রেসা প্রেস পিবি থেকে প্রকাশিত হয় এরিখ গ্রিয়েঙ্কের The drunken Boat & Other Poems—২০০৪ সালে পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয় জেরেমি হার্ডিং ও জন স্টার্ক অনূদিত Arthur Rimboud: Selected Poems and Letters—পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত হয় আরও অসংখ্য গ্রন্থ। এছাড়াও ১৯৯৪ সালে হেক্টর জাজু এবং অন্যান্য শিল্পীদের সহযোগে বের করা হয় গানের এ্যালবাম Sahara Blue। ১৯৯৫ সালে র‍্যাঁবো ও ভার্লেনের বিতর্কিত জৈবিক সম্পর্ককে উপজীব্য করে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র টোটাল একলিপ্স। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও র‍্যাঁবো চর্চার কমতি নেই। এখানেও র‍্যাঁবো ভক্তের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তাঁর জনপ্রিয়তাও ঈর্ষণীয়। কবিতার সাথে সম্পৃক্ত এমন কাউকেই এদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি তাঁর ‘নরকে এক ঋতু’ পাঠ করেননি। বাংলাভাষার কাব্য প্রেমিকদের কাছে সম্ভবত লোকনাথ ভট্টাচার্যই র‍্যাঁবোকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাঁর অনুবাদকৃত ‘নরকে এক ঋতুর’ মাধ্যমে। এছাড়াও পরবর্তী সময়ে  র‍্যাঁবোকে নিয়ে লিখেছেন-তাঁর ওপর আলোকপাত করেছেন বুদ্ধদেব বসু, অরুণ মিত্র, ভূমেন্দ্র গুহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী, সুস্নাত গঙ্গোপাধ্যায়, প্রয়াত আব্দুল মান্নান সৈয়দ, শিশির ভট্টাচার্য, ড. সফিউদ্দিন আহমদ প্রমুখ সাহিত্যিক, কবি ও গবেষকগণ। হাল আমলে তরুণ প্রজন্মের কবি গবেষক ড. বিনয় বর্মন প্রকাশ করেছেন ‘র‍্যাঁবোর কবিতা’ নামক ত্রিভাষার এক অনবদ্য গ্রন্থ। এ গ্রন্থে বাংলা, ইংরেজি অনুবাদের পাশাপাশি প্রকাশ করা হয়েছে মূল ফরাসি টেক্সট। র‍্যাঁবো প্রেমিকদের জন্য গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে একটি বড় উপহার বলে মনে করি।

এছাড়া র‍্যাঁবোর কবিতা এবং জীবন বিংশ শতাব্দীর লেখক, গায়ক এবং অন্যান্য শিল্পীদের জীবনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে তা কিছুতেই মুছে ফেলবার নয়। পাবলো পিকাসো, ডিলান থমাস, এ্যালেন গিনস্বার্গ,ভ্লাদিমির নভোকভ, বব ডিলান, প্লাতি স্মীথ, গিয়াননিনা ব্রাসছি, লিও ফারে, হেনরি মিলার, ভ্যান মরিসন এবং জিম মরিসন প্রবলভাবে তাঁর কবিতা এবং জীবনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। চলচ্চিত্র জগতও তাঁর প্রভাব থেকে বাদ যায়নি। ১৯৭০ সালে ইতালিয়ান ছবি নির্মাতা নীলো রিসি নির্মাণ করেছিলেন ‘নরকের এক ঋতু’। বলা বাহুল্য বাঙালি কবিদের মধ্যেও তাঁর প্রভাব কম বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে, এ কাতারে সামিল হয়েছিলেন অনেকেই। এখনও আমরা অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করে থাকি। যে র‍্যাঁবোকে একদিন প্যারীর কবিরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে বসিয়েছিলেন সঠিক শ্রদ্ধার আসনে। আজকে র‍্যাঁবো বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিদের দেবতা হিসাবে পূজনীয়, অনুসরণীয়।

লেখক পরিচিতি

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক ১ জুলাই ১৯৬১ সালে লালমনিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৮ সালে তিনি সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। সরকারি চাকুরিসূত্রে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘চাণক্যের কূটকৌশল’, ‘পাকিস্তান, পাপাচারের বিষবৃক্ষ’, ‘বাংলা বাঙালি বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গবন্ধু এবং বিশ্বের রাজনৈতিক হত্যা’, ‘একাত্তরের যুদ্ধজীবন’, ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ উল্লেখযোগ্য। গবেষণা ও প্রবন্ধ-গ্রন্থের পাশাপাশি তিনি কবিতাও রচনা করেছেন।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত