একজন অপরাজিতার নির্মাতা হয়ে ওঠার গল্প

নারী স্বাধীনতা আর লিঙ্গ সমতা, পথশিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম, জরুরি রক্তদান কর্মসূচি, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের বেঁচে যাওয়া খাবার ক্ষুধার্তদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার প্রজেক্ট ‘ফুড ব্যাংকিং’;  এমন বিভিন্ন ধরনের সামাজিক উদ্যোগ সফল করতে গিয়ে একটা সময় অপরাজিতা সংগীতা উপলব্ধি করেন, মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর জন্য চলচ্চিত্রই সবথেকে যথাযথ মাধ্যম। সিজেএমবির সঙ্গে তিনি শেয়ার করেছেন নিজের নির্মাতা হয়ে ওঠার সেই গল্প ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সিজু খান

সিজেএমবি: একজন নারী হয়েও নির্মাতা হতে চেয়েছেন, পারিবারিক বাধার মুখে পড়েননি?

অপরাজিতা সংগীতা: শুরুর দিকে বাঁধা ছিল, শক্তভাবেই ছিল। সেই বাধা ডিঙ্গাতে আমাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। ছোটবেলায় মা-বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন আমি ডাক্তার হবো। পড়াশোনায়ও ভালো ছিলাম, রেজাল্ট ভালো ছিলো। আমার অবশ্য ইচ্ছে ছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিক হওয়ার। সিনেমা বানাবো এই চিন্তা মাথার কোনও অংশেই ছিল না।

আমাদের দেশে মিডিয়ায় মেয়েদের কাজ করাটাকে তো ভালো চোখে দেখা হয় না। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে মিডিয়া খারাপ জায়গা, আর মিডিয়ায় যে মেয়েরা কাজ করে তারা সব ‘খারাপ মেয়ে’। এই কথা অবশ্য নারী নির্মাতার চেয়ে বেশি শুনতে হয় নারী অভিনয় শিল্পীদের।

আমি যখন প্রথম বাড়িতে জানালাম যে আমি মিডিয়ার কাজ করবো, সিনেমা বানাবো; সবার মাথায় যেনও আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিলো। সবার সে কী রাগ, অভিমান! একসময় সবাই যখন বুঝতে পারলো এই কাজটা করেই আমি আনন্দ পাই, তখন সবাই মেনে নিয়েছে। এখন আর কোন বাঁধা নেই বরং আমার কাজকে সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করে।

সিজেএমবি: সিনেমা যাত্রার সূচনা কীভাবে?

অপরাজিতা সংগীতা: শুরুটা হয়েছিলো আমি জাপানে থাকাকালীন। বাংলাদেশের প্রথিতযশা চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের ‘মাই জাপানিজ ওয়াইফ’ চলচ্চিত্রে ‘হাতে কলমে’ কাজ করার মধ্য দিয়ে। তখন প্রথম সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহটা বুঝতে পারি। এরপর দেশে ফিরেও আমি তাঁর ‘জীবনঢুলী’ চলচ্চিত্রে কাজ করি।

নির্মাণ কাজে ব্যস্ত অপরাজিতা

এছাড়া আমি অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলন করেছি,লেখালেখি করেছি। কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে চলচ্চিত্র খুব শক্তিশালী একটা মাধ্যম। কোনও বিষয়ে লিখে বা বলে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেয়ে চলচ্চিত্র মাধ্যমে বেশি সহজে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে চলচ্চিত্রের ভূমিকা এবং চলচ্চিত্র নিয়ে আমার আগ্রহ; দুটো মিলিয়ে আমি বুঝতে পারি নির্মাণই আমার আল্টিমেট গোল। এটা বুঝতে পারার পর নিজেকে তৈরি করার লক্ষ্যে আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে পড়াশুনা এবং প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি।

সিজেএমবি: চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে আপনার অন্যান্য কাজ নিয়ে একটু বলেন।

অপরাজিতা সংগীতাঃ পেশাগত জায়গা থেকে বললে, ফটোগ্রাফি আমার পেশা। আমার ছোট্ট একটা প্রোডাকশন হাউজ আছে। এছাড়া আমি বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত। পথশিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের বেঁচে যাওয়া খাবার ক্ষুধার্তদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার প্রজেক্ট ‘ফুড ব্যাংকিং’, জরুরি রক্তদান কার্যক্রমসহ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মত কিছু কাজের সাথে আমি দীর্ঘদিন যাবত যুক্ত।

সিজেএমবি: প্রিয় নির্মাতা কারা?

অপরাজিতা সংগীতা: দেশের মধ্যে আলমগীর কবির, জহির রায়হান, তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম এবং দেশের বাইরে ভিত্তরিও ডি সিকা, রবার্তো ব্রেসঁ, সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক।

সিজেএমবি: আপনার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেশ-বিদেশের উৎসবগুলোতে সাফল্য পেয়েছে। মিডিয়ার প্রচারও ছিল ইতিবাচক। এসব খ্যাতি-প্রশংসা আপনার কাজের প্রেরণা হয়তো, নাকি?

অপরাজিতা সংগীতা: খ্যাতি-প্রশংসা-পুরষ্কার এসব কার না ভালোলাগে? এগুলো তো একধরনের রিকগনাইজেশন। পাশাপাশি এগুলো আবার কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়ায়। ফলে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কাজকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

সাফল্যের স্বীকৃতি গ্রহণ করছেন অপরাজিতা

সিজেএমবি: পেশা হিসেবে নারীদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের এই পথ কতটা মসৃণ?

অপরাজিতা সংগীতা: স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে মেয়েদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাটা প্রায় একইরকম। আমাদের সমাজ এখনও একজন নারীর নির্দেশ শুনতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। ফলে দেখা যায় শুটিং চলাকালীন আমার সহকর্মীরাও অনেক সময় অসহযোগিতামূলক আচরণ করে। সমাজ পুরুষের প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়। চলচ্চিত্র যাত্রার শুরুর দিকে আমি কয়েকজন পুরুষ ডিরেক্টরের সিনেমায় কাজ করেছি। তখন দেখেছি সিনেমার সেটের মধ্যে একজন ডিরেক্টরকে সবাই ভীষণ মান্য করে।  কিন্তু আমি ডিরেক্টর হয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ক্রুদের মধ্যে কেমন একটা গা ছাড়া ভাব। ডিরেক্টরের চেয়ারে একজন নারীকে দেখে তাদের অস্বস্তি হয়। নারী আর পুরুষভেদে শুটিং স্পটের অনেকের অ্যাটিচ্যুড বদলে যায়। শুধু নারী বলেই যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বাড়তি এফোর্ট দিতে হয়। এটা খুব পীড়াদায়ক।

সিজেএমবি: আপনার চলচ্চিত্রের প্রাধান্যের কেন্দ্রেও নারী!

অপরাজিতা সংগীতা: আমরা নারীরা প্রায় সবাই প্রতিনিয়ত পুরুষদের দ্বারা কম-বেশি হেনস্থার শিকার হই। সেই ছোট বা বড় ঘটনা না চাইলেও আমাদের মধ্যে একটি প্রভাব তৈরি করে। আমাকেও অন্য দশজন নারীর মত অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বা এখনও যেতে হয়। সেসব ঘটনা থেকে প্রভাবিত হয়ে আমি আমার চলচ্চিত্রে নারীসত্তার খুব চেনাজানা অনুভূতিগুলোকে সামনে আনার চেষ্টা করেছি। এছাড়া পুরুষ নির্মাতারা নারী চরিত্রের উপস্থাপন করেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে৷ যেটা অনেক সময় সঠিক না-ও হতে পারে। তো, একজন নারী হিসেবে আমি যখন নারীদের চরিত্র, তাদের প্রতি বৈষম্য কিংবা সহিংসতা তুলে ধরি সেটার উপস্থাপনটা হয় নারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ফলে তা বাস্তবতার কাছাকাছি হয় বলে আমি মনে করি।

সিজেএমবি: বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা বেশ নাজুক, তবুও ওটিটি কেন্দ্রিক ওয়েব জগতে বেশ ভালো সম্ভাবনা দেখছেন অগ্রজ নির্মাতা-প্রযোজকেরা। আপনার বিবেচনায় ওটিটি কতটুকু সম্ভাবনাময়?

অপরাজিতা সংগীতা: যতদিন যাবে ওটিটির ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। তবে  সিনেমা হলের বড় পর্দা এবং পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখার ফিল ওটিটিতে পাওয়া যাবে না।

সিজেএমবি: লকডাউনে কী করছেন?

অপরাজিতা সংগীতা: বেশ কিছুদিন যাবত ‘যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়-ভিত্তিক বৈচিত্র্য’ বিষয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ চলছে। সেটার কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সব ঠিক থাকলে এ বছরের শেষে আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার  নির্মাণ কাজ শুরু হবে। সেটার স্ক্রিপ্ট নিয়েও কাজ করছি। এছাড়া আরেকটা কাজের কথা চলছে। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতার বায়োপিক বানাবো। নাম এখনই বলছি না, আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে সবাইকে জানাবো।

সিজেএমবি: মূলধারার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে কি?

অপরাজিতা সংগীতা: মূলধারার চলচ্চিত্র বলতে আমরা সাধারণত বিনোদনধর্মী বানিজ্যিক চলচ্চিত্রকে বুঝি। তবে স্রেফ বিনোদিত করা কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমি কখনোই চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো না। আমি শিল্পমানসম্মত এবং বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই। সেই চলচ্চিত্র যদি দর্শক সমাদৃত হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়ে মূলধারায় মিশে যায় তাতে আমার আপত্তি নেই।

লেখক পরিচিতি

সিজু খান
সিজেএমবি'র শিল্প সম্পাদক ও নির্মাতা।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত