এক বছরে মানুষকে যা শেখালো করোনাভাইরাস

ভাষান্তর: মোকাররম রানা ও মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুম

আমরা কীভাবে বড় প্রেক্ষাপটে করোনা মহামারির এই বছরটাকে দেখতে পারি?

অনেকেই মনে করেন, আমরা প্রকৃতির কাছে কত অসহায়  করোনাভাইরাস তা সামনে এনেছে। বাস্তবতা হলো,  ২০২০ সালে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবজাতি এখন আর অসহায় নেই। কোনো মহামারিই আর এই মুহূর্তে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। বিজ্ঞানের কল্যাণে এগুলো এখন সমাধান করার মতো বিপদে পরিণত হয়েছে।

তাহলে করোনাভাইরাসের কারণে এত মানুষের ভোগান্তি বা মৃত্যুর কারণ কী?   এর কারণ হলো, বাজে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

এর আগেও মানবজাতি বিভিন্ন মহামারির মুখে পড়েছে। সে সময় মহামারির কারণ সম্পর্কে বা কীভাবে একে প্রতিরোধ করা যাবে সেটি নিয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না।

১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীরাও এটি সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। বিফলে গিয়েছিল অনেকগুলো প্রতিরোধী ব্যবস্থাও। মহামারির টিকা তৈরির উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।  কিন্ত করোনাভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই নতুন ধরণের মহামারির বিপদসংকেত দেয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারির মধ্যে বিজ্ঞানীরা এই মহামারির জন্য দায়ী ভাইরাসটিকে শনাক্ত করে ফেলেন। একইসঙ্গে ভাইরাসের জীবন রহস্যও উন্মোচন করে সমস্ত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে দেন। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা গেছে,  কী করলে সংক্রমণের মাত্রা কমবে এবং বন্ধ হয়ে যাবে।

এখন এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্যাপক পরিসরে টিকা বানানো হচ্ছে। রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এর আগে মানুষ কখনোই এতটা শক্তিশালী ছিল না।

জীবন যখন অনলাইনে

বায়োটেকনোলজির সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে করোনা মহামারির এই বছরে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আগের যুগে মানবজাতি খুব অল্প ক্ষেত্রেই মহামারি ঠেকাতে পেরেছে। কারণ, আগে কখনোই সংক্রমণের মাত্রা ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। আরেকটা কারণ হলো, লকডাউনের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি, তা অপূরণীয়।

১৯১৮ সালে শুধু তাদেরকেই কোয়ারেন্টাইনে রাখা হতো, যাদের মধ্যে সংক্রমণের পুরো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্ত ভাইরাসের বাহক হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বা কোনো লক্ষণই নেই এরকম কাউকে শনাক্তও করা যায়নি। এদের লকডাউনেও রাখা যায়নি। সেসময় পুরো দেশের মানুষকে কয়েক সপ্তাহের জন্য বাসায় রাখার উপায় ছিল না। সেটি করলে অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক অস্থিতিশীলতা এবং না খেয়ে থাকাও এড়ানো যেত না।

২০২০ সালে এর বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল নজরদারি দিয়েছে রোগ ছড়ানোর কেন্দ্রগুলো শনাক্ত করা অনেক সহজ করে দিয়েছে।  এতে মানুষকে কোয়ারেন্টিনে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং রোগ ছড়ানো অনেকটাই কমানো গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, অটোমেশন ও ইন্টারনেটের প্রাবল্যের কারণে লকডাউন এখন আর অতটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই লকডাউনের মধ্যেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব হচ্ছে। অন্তত উন্নত দেশগুলোতে এর কারণে অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ছে না। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে তারা সেই আগের মহামারির অভিজ্ঞতাই নতুন করে ভোগ করছে। সব মিলিয়ে উন্নত দেশগুলোতে ডিজিটাল বিপ্লবের কারণে আসলে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে।

কৃষির কথাই ধরা যাক। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ফসল ফলানো মূলত নির্ভর করত মানুষের শারীরিক শ্রমের ওপর। তখন ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষি কাজ করত।  কিন্তু এখন উন্নত দেশগুলোতে সেটি আর নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ দেড় শতাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে। কিন্তু এদের কৃষি কাজই পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটায়। শুধু তাই নয় এই দেড় শতাংশ মানুষের শ্রমই যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্রায় সব কৃষিকাজই এখন মেশিনে করা হয়। এর ফলে অনেক রোগ থেকে মানুষ রক্ষা পেয়ছে। লকডাউন কৃষিকাজে খুব অল্প প্রভাবই ফেলতে পেরেছে।

আগের দিনের মহামারির সময়ে কোনো একটা গম খেতের কথা চিন্তা করুন। আপনি যদি ওই খেতের কৃষকদের কৃষি কাজ বাদ দিয়ে বাড়িতে থাকতে বললে অনেক মানুষ ক্ষুধায় মারা যাবে। আবার তারা খেতে কাজ করলেও মহামারিতে আক্রান্ত হতে পারে।

তাহলে কী করার আছে?

এবার একই গমখেতের কথা ২০২০ সালের প্রেক্ষাপটে ভাবুন। শুধু একটি জিপিএস চালিত মেশিনের মাধ্যমে পুরো একটি খেত অতি অল্প সময়ে চাষ করে ফেলা যাবে। এতে কোনো সংক্রমণের ভয়ও নেই।  ১৩৪৯ সালে একজন কৃষক যেখানে দিনে পাঁচ বুশেল (শস্য কাটার পরিমাণ) গম কাটতে পারতেন সেখানে ২০১৪ সালে একটা মেশিন দিনে ৩০০০০ বুশেল কাটার রেকর্ড করেছে। করোনাভাইরাস ধান, গম ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্য শস্য উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি।

মানুষের খাদ্য জোগানোর জন্য শুধু উৎপাদনই যথেষ্ট নয়। সেটি তাদের দরজায়ও নিয়ে যেতে হবে। এই দূরত্ব কখনও কখনও হাজার কিলোমিটারের উপরে। ইতিহাসে সব মহামারির গল্পেই বাণিজ্য খলনায়কের ভূমিকা পালন করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রেনের মাধ্যমেই মারাত্মক ভাইরাসগুলো পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ত।  উদাহরণ হিসেবে ব্ল্যাক ডেথ নামের মহামারির কথা বলা যায়।  এটি পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল শুধুমাত্র সিল্করোড ধরে।  জেনোয়ার কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ তখন ইউরোপের দিকে যাচ্ছিল, ওই জাহাজের মাধ্যমে ইউরোপেও ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়ে।

বাণিজ্য এরকম হুমকি হয়ে ওঠার কারণ, প্রতিটি বাণিজ্যিক ট্রেনে এক জন চালক ও কর্মী থাকতে হতো। প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজে কয়েক ডজন মাঝি লাগত। মানুষে ঠাসা এই যানবাহনগুলো ছিল মহামারি ছড়ানো জীবাণুর বেহেস্ত। ২০২০ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য এত ভালোভাবে চলার বড় কারণ হলো, এখন খুব কম মানুষ এই কাজে জড়িত। বর্তমানে একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনচালিত জাহাজ আগের যুগের যেকোনো নৌবহরের চেয়ে বেশি মালামাল বহন করতে পারে। ১৫৮২ সালে ইল্যাংন্ডের একটি বাণিজ্য বহরের ধারণ ক্ষমতা ছিল সর্বোচ্চ ৬৮ হাজার টন। এর জন্য কমপক্ষে ১৬ হাজার মাঝিমাল্লা লাগত।

২০১৭ সালে হংকংয়ের ওওসিএল বাণিজ্য জাহাজের ধারণক্ষমতা ২ লাখ টনেরও বেশি। অথচ এই জাহাজের ক্রুয়ের সংখ্যা মাত্র ২২ জন!  সত্যি কথা বলতে, টুরিস্ট ভর্তি জাহাজ ও যাত্রী ভর্তি বিমান করোনা ভাইরাসের মহামারি হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখন বাণিজ্যের জন্য পর্যটন ও ভ্রমণের দরকার নেই।

পর্যটকরা বাড়িতে থাকতে পারে আর ব্যবসায়ীরা অনলাইনেই ব্যবসা চালাতে পারে। কেননা স্বয়ংক্রিয় জাহাজ ও প্রায় মানুষবিহীন ট্রেন পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকে চালিয়ে নিতে পারে। ২০২০ সালে বৈশ্বিক পর্যটন মুখ থুবড়ে পড়লেও সমুদ্রপথের বাণিজ্যের মাত্র চার শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সাফল্য সেবা খাতেও একটা বড় প্রভাব ফেলেছে।

১৯১৮ সালে চিন্তাই করা যেত না যে অফিস, স্কুল,  আদালত বা ধর্মচর্চা কেন্দ্র লকডাউনের সময়েও  চলতে পারে। ছাত্র-শিক্ষকরা যদি বাড়িতেই থাকে তাহলে ক্লাস নেয়া হবে কীভাবে? এখন আমরা এর উত্তর জানি। যদিও ইন্টারনেটের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটি অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। দেখা যাচ্ছে, অনলাইন কোর্টে উকিলরা বিড়াল সেজে হাজির হচ্ছে। তবুও বাস্তবতা হচ্ছে, ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহ করোনা মহামারির অনেক ক্ষতি থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

১৯১৮ সালে মানবজাতি কেবল ইটকাঠ গাছপালার বাস্তব দুনিয়াতেই চড়ে বেড়াচ্ছিল। যখন কোনো মারাত্মক ভাইরাস এসে এই দুনিয়ায় হাজির হতো, মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা থাকত না। এখন আমরা দুটি জগত থাকি। বাস্তব জগতের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জগত হলো ভার্চুয়াল জগত। করোনা মহামারি বাস্তব জগতে ছড়িয়ে পড়লে বেশিরভাগ মানুষ তাদের জীবনের একটা বড় অংশ অনলাইনে সরিয়ে আনলো, যেখানে করোনাভাইরাস ঢুকতে পারবে না। অবশ্যই, মানুষ এখনও রক্তমাংস দিয়ে গড়া। সবকিছুকে ডিজিটাল করে ফেলাও সম্ভব নয়।

করোনা মহামারির এই বছরটি এটিও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, অনেক কম মজুরির পেশার মানুষই আমাদের এই সভ্যতা টিকিয়ে রাখে। যেমন নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ট্রাক ড্রাইভার, ক্যাশিয়ার ও ডেলিভারি ম্যান। কথায় আছে, মাত্র তিন বেলা না খেয়ে থাকা যেকোনো সভ্যতাকে বর্বরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ২০২০ সালে ডেলিভারিম্যানেরাই খুব সূক্ষ্মভাবে এই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। তারা আমাদের রক্তমাংসের জগতের সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইন্টারনেট চালু ছিল

মানব সভ্যতা যন্ত্র, ডিজিটাল মাধ্যম ও অনলাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটা আমাদের নতুন বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, প্রায় সব কিছু বন্ধ হয়ে গেলেও ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। একটা সেতুর ওপর দিয়ে হুট করে যদি লোক চলাচল বেড়ে যায়, তাহলে সেখানে জ্যাম লেগে যেতে পারে। এমনকি সেতুটা ভেঙেও যেতে পারে। ২০২০ সালে স্কুল, অফিস ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় রাতারাতি অনলাইনে চলে এসেছিল। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমন চিন্তা আমাদের মাথায় নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, এ নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত।

২০২০ সালে আমরা এটি জেনেছি যে, পুরো দেশ লকডাউনে গেলেও প্রতিদিনের জীবন থেমে থাকবে না। কিন্তু এখন একটু ভেবে দেখুন তো, যদি আমাদের ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে তাহলে কী হতে পারে?  ভাইরাসের বিপদের মুখে তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের অনেকটাই স্বাভাবিক থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের ম্যালওয়ার (কম্পিউটার ভাইরাস) ও সাইবার যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। লোকজন প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, ‘করোনা মহামারির পরের সংকটটা কী?’ আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপরে আঘাতই হতে পারে করোনা মহামারির মতো সম্ভাব্য সংকট। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়াতে ও লাখ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। কিন্তু আমাদের ইন্টারনেট অবকাঠামো মাত্র একদিনেই ভেঙে পড়তে পারে।

করোনার সময়ে খুব দ্রুতই স্কুল ও অফিসগুলো অনলাইনে চলে যেতে পেরেছে। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ইমেইল থেকে শামুক গতির ডাকঘর যুগে ফিরে যেতে কত সময় লাগতে পারে বলে আপনার ধারণা?

কোনটি গুরুত্বপূর্ণ

করোনা মহামারির এক বছর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ না পারাকে আমাদের সামনে হাজির করেছে। এটি হলো, বিজ্ঞান কখনও রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না। জনগণের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমাদের অনেক পক্ষের স্বার্থ ও মূল্যবোধ আমলে নিতে হয়। কার স্বার্থ ও মূল্যবোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি বোঝার কোনো বৈজ্ঞানিক উপায় নেই। এ কারণে আমাদের কী করা উচিত তারও কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। উদাহরণ হিসেবে লকডাউন আরোপের কথা বলা যায়। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শুধু এটুকু জিজ্ঞাসা করাই যথেষ্ট নয় যে, লকডাউন না দিলে করোনায় কত মানুষ মারা যাবে?  এর বদলে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, লকডাউন দিলে কত মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগবে?  কত জন অপুষ্টির শিকার হবে? কতজন স্কুলে যেতে পারবে না? কত জন চাকরি হারাবে? এমনকি লকডাউনের সময় ঘরে থাকা অবস্থায় কত জন তাদের স্বামী বা স্ত্রীর হাতে খুন-জখম হতে পারেন?

সব তথ্য যদি সঠিক ও বিশ্বাস করার মতোও হয়, এরপরেও সবসময়ই প্রশ্ন করা উচিত, ‘কোনটিকে আমরা গুরুত্ব দিব? এটি কে ঠিক করবে? এক তথ্যের বদলে অন্য তথ্যকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব?’ এই কাজটি যতটা না বিজ্ঞানের, তার চেয়ে বেশি রাজনীতির।  স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে সবার উপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটি রাজনীতিকদের।    একই ভাবে, লকডাউনের সময় আমরা যাতে কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারি সেজন্য ইঞ্জিনিয়াররা নয়া নয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলছেন। নজরদারির নতুন যন্ত্রপাতি করোনার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আমাদের সাহায্য করেছে।

কিন্তু একইসঙ্গে এটি আমাদের গোপনীয়তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। একে ব্যবহার করে এমন জুলুমবাজ শাসন শুরু হয়েছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। গত বছর থেকে জনগণের গোপনীয়তার ওপর হামলা অনেকটাই বৈধ ও সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মহামারি ঠেকানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অজুহাতে কি আমরা নিজেদের স্বাধীনতাকে ধ্বংস হতে দিব?  মহামারি ঠেকাতে নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু এটি যেন মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে না দেয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে ভূমিকা রাখতে হবে রাজনীতিকদের।

তিনটি সহজ নিয়ম আমাদের ডিজিটাল স্বৈরাচার থেকে বাঁচাতে পারে। প্রথমত, যখনই নাগরিকদের স্বাস্থ্যগত তথ্য নেয়া হবে সেটি যেন তাদের সাহায্য করতেই ব্যবহার করা হয়। কোনোভাবেই এই তথ্য কাউকে নিয়ন্ত্রণ করা, কোন কিছু করতে বাধ্য করা বা ক্ষতি করার কাজে ব্যবহৃত হতে দেয়া যাবে না। ডাক্তাররা আমাদের শরীরের সবচেয়ে গোপন তথ্যটিও জানেন। সেটি নিয়ে আমাদের তেমন দুশ্চিন্তা হয় না। আমরা জানি, ডাক্তার আমাদের ভালোর জন্যই এই তথ্য কাজে লাগাবেন। কিন্তু কোনোভাবেই এটি ঠিক হবে না, যদি তারা আমাদের তথ্য কোনো কর্পোরেশন বা রাজনৈতিক দলের কাছে বিক্রি করে দেন।  একই ভাবে মহামারি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি চালানো প্রতিষ্ঠানও আমাদের শরীর সম্পর্কিত তথ্যগুলো যেন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, নজরদারি যদি চলে তাহলে সেটি দুই পক্ষকেই করতে হবে। নজরদারির ক্ষমতা যদি শুধু রাষ্ট্রের থাকে তাহলে এটি স্বৈরাচার তৈরির সবচেয়ে সহজ রাস্তা। যখনই নাগরিকের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে, তখন আমাদের উচিত সরকার ও বড় কর্পোরেশনগুলোর ওপরেই নজরদারি বাড়ানো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনা মহামারির সময়ে সরকার বিপুল পরিমাণ টাকা বিভিন্ন খাতে সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে। কাকে কেন টাকা দেয়া হচ্ছে, কত টাকা দেয়া হচ্ছে এর পরিষ্কার হিসাব থাকা জরুরি। নাগরিক হিসেবে আমরা যেন সহজেই দেখতে পারি, কে টাকা পাচ্ছে, কেন পাচ্ছে?  সরকারি সহায়তার টাকা সত্যিকারের প্রয়োজনের ব্যবসার বদলে কোনো মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিত হওয়া দরকার। সরকার যদি বলে মহামারির সময়ে সহায়তার টাকার হিসাব রাখা কঠিন কাজ, তাহলে এটি বিশ্বাস করবেন না। আপনি কী করেন সেটি নজরদারি করা যদি কঠিন কিছু না হয়, তাহলে সরকার কী করছে তার ওপরেই নজর রাখা কঠিন কিছু নয়।

তৃতীয়ত, বিপুল পরিমাণ ডাটা (তথ্য) যেন কখনোই এক জায়গায় জমা হয়ে না থাকে। মহামারি কিংবা স্বাভাবিক অবস্থা, কোনো সময়েই এটি হতে দেয়া যাবে না।  তথ্যের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ স্বৈরাচারের অন্যতম হাতিয়ার। মহামারি ঠেকাতে যদি জনগণের বায়োমেট্রিক ডাটা (স্বাস্থ্য ও পরিচয় বিষয়ক তথ্য) নিতেই হয় তাহলে তার জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা থাকতে হবে। এর জন্য পুলিশের দরকার নেই। সংগ্রহ করা বায়োমেট্রিক ডাটা সরকারের অন্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ভাণ্ডার থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। কোনোভাবেই এই ডাটা যেন বড় কর্পোরেশনের কাছে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এটি আসলে এক রকম বাড়াবাড়িই। এতে কাজের গতিও কমে যেতে পারে। কিন্তু এই গতি কমানো কোনো অক্ষমতা নয়। বরং এটি একটি উপায়। আপনি যদি ডিজিটাল স্বৈরাচারের উত্থান ঠেকাতে চান, তাহলে কিছু অসুবিধা মেনে নিতেই হবে।

অনেক কিছুই নির্ভর করছে রাজনীতির ওপরে

২০২০ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত সাফল্যও করোনা মহামারির সমাধান করতে পারেনি। এই সাফল্য মহামারিকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রাজনৈতিক তামাশায় রূপান্তরিত করেছে। ব্ল্যাক ডেথে লাখ লাখ মানুষে মারা গিয়েছিল। কিন্তু কেউ আশা করেনি, রাজা-বাদশাহরা তাদের জন্য কিছু করবে। মহামারির প্রথম ধাক্কাতেই ইংল্যান্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। তবুও ইল্যাংন্ডের তখনকার রাজা এওয়ার্ডকে সিংহাসন হারাতে হয়নি।

মহামারি ঠেকানোর ক্ষমতা আগের যুগের রাজা বাদশাহদের ছিল না। তাই এ বিষয়ে তাদের কেউ দোষও দিতে যায় নি।  এখন করোনাভাইরাস ঠেকানোর মতো সরঞ্জাম রয়েছে মানুষের রয়েছে। ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ প্রমাণ করেছে, টিকা ছাড়াও হাতের কাছে সরঞ্জাম দিয়েই মহামারি ঠেকানো সম্ভব। এর জন্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষতিও মেনে নিতে হয়েছে। করোনাভাইরাসকে ঠেকানো সম্ভব। তবে এর জন্য যে সাময়িক ক্ষতি হবে তা মেনে নেয়ার ব্যাপারে আমরা এখনও নিশ্চিত নই। এ কারণে বিজ্ঞানের সাফল্য রাজনীতিকদের কাঁধে একটি বিশাল দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, অনেক রাজনীতিক এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ডেভিড বলসোনারোর কথা বলা যায়। এই প্রেসিডেন্টরা মহামারির বিপদকে জনগণের সামনে খাটো করে দেখিয়েছিলেন। এরা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও শোনার বদলে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করেছেন। তারা মহামারি ঠেকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যকর নেয়া দূরের কথা, উল্টো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চেষ্টাকেও নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছেন।  শুধুমাত্র ট্রাম্প ও বলসোনারা প্রশাসনের অবহেলার কারণে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ চাইলেই এদের মৃত্যু ঠেকানো যেত।

যুক্তরাজ্যের সরকারও করোনাভাইরাস ঠেকানোর চেয়ে ব্রেক্সিট নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল। জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পটু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের প্রশাসন জনগণকে করোনাভাইরাস থেকে আলাদা করতে পারেনি। দেশটিতে করোনা ভাইরাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্বে মৃত্যুহারের দিক থেকে এটি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্য দুটি দেশই এখন টিকার চাহিদা মেটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথচ, ইতোমধ্যে তাদের শুরুর দিকের ভুলগুলোর জন্য কঠোর মূল্য চুকাতে হয়েছে। করোনা শনাক্ত হওয়ার গড়ের দিক থেকে বিশ্বে ইসরায়েল সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। মহামারি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশন ফাইজারের সঙ্গে চুক্তি করেছে দেশটি। এটি হলো, ডাটার বিনিময়ে টিকা। ইসরায়েলের জনগণের জন্য পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ করবে ফাইজার। এর বিনিময়ে কর্পোরেশনটির হাতে নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান তথ্য তুলে দিবে সরকার। ইতোমধ্যে ইসরায়েলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তথ্যের ওপর সরকার ও করপোরেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও বোঝা যাচ্ছে, নাগরিকদের তথ্য এখন সবচেয়ে মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

মহামারি ঠেকাতে কিছু দেশের সাফল্যের পরেও আমরা বড় মাপে একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছি। ২০২০ এর প্রথম দিকের মাসগুলো ছিল ধীর গতিতে ঘটতে থাকা একটা দুর্ঘটনা দেখার মতো। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মানুষ চীনের উহান ও এরপরে ইতালিসহ অন্য দেশের দুরাবস্থা দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু এই বিপর্যয় ঠেকানোর মতো বৈশ্বিক নেতৃত্ব ছিল না। মহামারি ঠেকানোর সব সরঞ্জামই ছিল, শুধু ছিল না রাজনৈতিক বোঝাপড়া।

উদ্ধারে এগিয়ে এলেন যারা

করোনা মহামারির সময় বিজ্ঞানের সাফল্য ও রাজনীতির ব্যর্থতার মধ্যে একটি বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। এর কারণ বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা পরস্পরকে সহযোগিতা করেছেন। অন্যদিকে, রাজনীতিকরা ব্যস্ত ছিলেন ঝগড়া-বিবাদে। অনেক অনিশ্চয়তা এবং চাপের মধ্যেও তারা কাজ করে গেছেন। বিশ্বজুড়ে নিজদের মধ্যে অবাধে তথ্য বিনিময় করেছেন। একই সঙ্গে অন্যদের অনুসন্ধান ও বোঝাপড়ার ওপরও নির্ভর করেছেন। তাদের আন্তর্জাতিক দলগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও করেছে। উদাহরণ হিসেবে লকডাউন নিয়ে একটি গবেষণার কথা বলা যায়। এতে যুক্তরাজ্য, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নয়টি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা যৌথভাবে কাজ করেছেন।

অন্যদিকে, রাজনীতিকরা মহামারি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক জোট তৈরি ও একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনায় একমত হতে পারেননি। বিশ্বের শীর্ষ দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের বিরুদ্ধে জরুরী তথ্য আটকানো, মিথ্যা তথ্য দেয়া ও ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার মতো অভিযোগ করেছে। আবার অনেক দেশই মহামারি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে বা তথ্য গোপন করেছে। বৈশ্বিক সহযোগিতার অভাব শুধুমাত্র তথ্যযুদ্ধেই প্রকাশ পায়নি। চিকিৎসার সরঞ্জাম নিয়েও অনেক দেশ বিরোধে জড়িয়েছে। সহযোগিতা ও উদারতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে সহজলভ্য সরঞ্জামকে চিহ্নিত করা, এর বৈশ্বিক উৎপাদন বাড়ানো ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে তেমন কোনো চেষ্টা ছিল না। বরং টিকা নিয়েও নতুন বৈষম্য তৈরি হয়েছে। কিছু দেশের জনগণ টিকা পাচ্ছে, কিছু দেশ পাচ্ছে না। একে এখন বলা হচ্ছে, ‘টিকা জাতীয়তাবাদ’।

দুঃখের বিষয়, অনেকেই মহামারি সম্পর্কে একটি সরল সত্য বুঝতে ব্যর্থ হন। যতক্ষণ ভাইরাস কোথাও না কোথাও ছড়িয়ে পড়ে, কোনো দেশই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ নয়। ধরা যাক, ইসরায়েল বা যুক্তরাজ্য তার সীমান্তের ভেতরে ভাইরাস নির্মূলে সফল হয়েছে। তবে ভারত, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাজিলের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাইরাসটির নতুন রূপান্তর টিকাকে অকার্যকর করে তুলতে পারে। এর ফলে আবার নতুন করে ছড়িয়ে পারতে পারে সংক্রমণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যের উপকারের আবেদন হয়ত জাতীয় স্বার্থের বেশি গুরুত্ব পাবে না। তবে এই মুহূর্তে অন্যের কথা ভাবা নিছক পরোপকারীতা নয়। জাতীয় স্বার্থেই মহামারি ঠেকাতে বৈশ্বিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্বের জন্য টিকা 

২০২০ সালে ঘটা বিষয় নিয়ে তর্ক আরও বহু বছর ধরে চলবে। কিন্তু সব রাজনৈতিক পক্ষেরই মহামারির তিনটি শিক্ষার বিষয়ে একমত হওয়া দরকার। প্রথমত, আমাদের আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষা করা দরকার। করোনা মহামারির সময় এটি আমাদের উদ্ধার করেছে। তবে শিগগিরই এটি আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের উৎস হতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক দেশের উচিত স্বাস্থ্য খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা। এটি নতুন করে বলাটা অদরকারি মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিক ও ভোটাররা প্রায়ই সবচেয়ে জরুরি বিষয়কে এড়িয়ে যান। তৃতীয়ত, মহামারি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধের জন্য আমাদের একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যুগ যুগ ধরে মানুষ ও জীবাণুর যুদ্ধে, প্রত্যেক মানুষের শরীরই সম্মুখসারিতে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় কেউ আক্রান্ত হলে সেটি আমাদের সবাইকে বিপদে ফেলবে। এ কারণে সবচেয়ে উন্নত দেশের ধনী ব্যক্তিদেরও স্বল্পোন্নত দেশের গরিব মানুষকে রক্ষা করার দায় রয়েছে। কোনো নতুন ভাইরাস যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জঙ্গল থেকে গরিব গ্রামবাসীকে আক্রান্ত করে, তবে কয়েক দিনের মধ্যে সেটি ওয়াল স্ট্রিটেও পৌঁছে যেতে পারে।

ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মহামারি ঠেকানোর জন্য দরকারি কাঠামো রয়েছে। তবে এই খাতে বাজেট খুবই কম। এর পেছনে তেমন কোনো রাজনৈতিক সমর্থনও নেই। এই সংস্থাগুলোর হাতে আমাদের কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা ও টাকা-পয়সা তুলে দিতে হবে, যাতে তাদের পুরোপুরিভাবে স্বার্থপর রাজনীতিকদের ওপর নির্ভর না করতে না হয়। এই প্রস্তাব শুনে ভাববেন না, আমি অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়ার কথা বলছি। এই ক্ষমতা নির্বাচিত রাজনীতিকদেরই কাছেই থাক।  তবে স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য জোগাড়, সম্ভাব্য ঝুঁকি পরীক্ষা, বিপদ আসার আগে সতর্ক বার্তা দেয়া এবং গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য এক ধরণের স্বাধীন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।

অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, করোনার পরেও আরও নতুন মহামারি আসবে। তবে চলমান মহামারি থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে মহামারির ঘটনা কমে আসবে। আমরা নতুন রোগজীবাণুর আগমন ঠেকাতে পারব না। এটি প্রাকৃতিক বিবর্তন প্রক্রিয়া, যা কয়েক কোটি বছর ধরে চলে আসছে। নতুন রোগজীবাণুর আগমন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে নতুন রোগজীবাণু ছড়ানো বন্ধ করে মহামারি হওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং সরঞ্জাম এখন আমাদের কাছে রয়েছে। এরপরেও করোনা মহামারি যদি ২০২১ সালেও চলতে থাকে এবং লাখ লাখ মানুষ মারা যায় অথবা এর চেয়ে ভয়াবহ মহামারি যদি ২০৩০ সালেও মানবজাতির ওপর আঘাত করে, তাহলে এটি কোনো অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে শাস্তি হবে না। এটি হবে মানুষের ব্যর্থতা। আরও স্পষ্টভাবে বললে- রাজনৈতিক ব্যর্থতা।

লেখক পরিচিতি

ইউভাল নোয়াহ হারারি
একজন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক। তিনি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। স্যাপিয়েন্স, হোমো ডিউস ও টুয়েন্টি ফার্স্ট লেসনস ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি নামের তিনটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত