ওটিটি কি সিনেমার নবযাত্রার প্ল্যাটফর্ম?

লকডাউনের দিনগুলোতেও থেমে নেই সিনেমা দেখা। ঘরবন্দি মানুষের সময় কাটছে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে। ওভার দা টপ স্ট্রিমিং বা ওটিটি প্লাটফর্মগুলোতে ওয়েব সিরিজ, ডকু ড্রামা, সিনেমার নেশায় মত্ত হচ্ছেন মানুষ। হলবিমুখ মানুষেরাও চোখ রাখছেন এতে।

লকডাউনেও লাভ করে যাচ্ছে ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, এমাজন প্রাইম, ডিজনি প্লাস, মুবি, এইচবিও ম্যাক্স, জি ফাইভ, ইরস নাউ, হইচই, আড্ডা-টাইমস, বিঞ্জে, বঙ্গবিডি, সিনেম্যাটিকসহ শতাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। লাভের খোঁজে বিনিয়োগও শুরু হয়েছে। বাড়ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা। চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলীরাও নতুন কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। কাঁটাছেড়ার ভয় না থাকায় এসেছে পরিবর্তন। বদলে যাচ্ছে গল্প এবং নির্মাণ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলছে। অস্কারসহ নামীদামী সব পুরষ্কারও পাচ্ছে এসব কন্টেন্ট। অস্কারে এ পর্যন্ত ৮৯টি মনোনয়নসহ ৮টি পুরষ্কার জিতেছে ওটিটি প্লাটফর্মের (নেটফ্লিক্স) কন্টেন্ট। শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র, পরিচালক এবং সিনেমাটোগ্র্যাফির জন্য ২০১৯ সালে অস্কারের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ‘রোমা’। সেরা ডকু ফিচার বিভাগে ২০১৮ এবং ২০২০ সালে একই পুরষ্কার পেয়েছে ‘ইকারাস’ ও ‘আমেরিকান ফ্যাক্টরি’। এছাড়াও নেটফ্লিক্সের অরিজিনাল সিরিজ ডার্ক, মানি হেইস্ট এবং স্যাক্রেড গেইমসের সিজনগুলো সব মহলেই পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। মার্টিন স্করসিজ, আলফেনসো কোয়ারন, হিরোকাজু করিডা, মিরা নায়ার, রিচি মেহতা, অনুরাগ কাশ্যপ, মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজার মতো নামীদামী পরিচালকেরাও এখন ওটিটি’র দিকে ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশেও পড়েছে এর প্রভাব। ভারতীয় বাংলা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই, আড্ডাটাইমস, জি ফাইভ যেমন ব্যবসা করছে তেমন দেশের বায়োস্কোপ, বঙ্গবিডি, বিঞ্জে, আই-থিয়েটার, সিনেম্যাটিকও করছে। অনন্য মামুনের বানানো শাকিব খানের বাণিজ্যিক ছবি ‘নবাব এলএলবি’, রায়হান রাফির পরিচালনায় ‘জানোয়ার’ দেখেছে সফলতার মুখ। কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় নির্মিত অরিজিনাল সিরিজ ‘একাত্তর’ও দেখেছে অনেকে।

‘হইচই’ এ সৈয়দ আহমেদ শাওকি’র প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘তকদীর’ দুই দেশেই পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। চঞ্চল চৌধুরী, সানজিদা প্রীতি, মনোজ প্রামাণিক, সোহেল মন্ডল অভিনিত এই ওয়েব সিরিজের সফলতার মধ্যেই জি-ফাইভে মুক্তি পায় আরেফিন শুভ, চঞ্চল চৌধুরী, মিথিলা, মম, তারিক আনাম খান অভিনিত ওয়েব সিরিজ ‘কন্ট্র্যাক্ট’। থ্রিলার লেখক নাজিম উদ্দীনের উপন্যাস অবলম্বনে তানিম নুর-কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় নির্মিত এই ওয়েব সিরিজটির রেশ কাটেনি এখনো। ‘হইচই’ এর জন্য নির্মিত আশফাক নিপূণের ওয়েবফিল্ম ‘কষ্টনীড়’ও বেশ প্রশংসিত হয়েছে ওয়েব জগতে।

ট্রান্সকম গ্রুপ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আগামী ৩ জুন দেশে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ‘চরকি’। এর চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) হচ্ছেন নির্মাতা ‘রেদওয়ান রনি’। সংশ্লিষ্টদের আলাপের কারনে অনলাইন জগতে বেশ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত এই নির্মাতার নতুন উদ্যোগ।

অমিতাভ রেজা চৌধুরী

ওটিটি ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনা নিয়ে নির্মাতা অমিতাভ রেজা বলেন, ‘সিনেমার সম্ভাবনা যেটা তা হচ্ছে যে, ওটিটি থেকে new kind of audiences (নতুন ধরনের দর্শক) তৈরি হবে, পাশাপাশি new kind of actor, actress (নতুন ধরনের অভিনেতা, অভিনেত্রী)রাও তৈরি হচ্ছে which is good, very good” (যেটা ভালো, খুব ভালো।).

জনপ্রিয় এই নির্মাতা মনে করেন ওটিটি প্লাটফর্মে সেন্সরের নামে কাঁটাছেড়া করা সম্ভব না। তবে শৃঙ্খলার স্বার্থে শুধু কিছু guideline maintain (নির্দেশনা অনুসরণ) করা যেতে পারে।

 

 

আরেক চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী-ও ওটিটি প্লাটফর্মের জন্য কাজের ঘোষণা দিয়েছেন। এই বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বক্তব্য এবং তার ফেসবুকের টাইমলাইনের লেখা দেখার পরামর্শ দেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

গত ২৮ জানুয়ারি রাতে কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়ে ফারুকী নিজের ফেসবুক পাতায় লেখেন, ‘পরিবর্তন যে আসন্ন এটা আমরা গত কয়েক বছর ধরেই অনুভব করছিলাম এবং সেই পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করতে কোনও দ্বিধাও ছিল না! একসময় টিভির জন্য কাজ করতাম! তারপর থিয়েটারের জন্য সিনেমা বানানোর সুযোগ আসলো! এখন সারা দুনিয়াজুড়েই ওটিটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে! সারা দুনিয়ার ফিল্মমেকাররাই ওটিটি নিয়ে ভাবছেন বা কাজ করছেন! আমিও গত কয় বছর ধরেই এটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম! তারপরও বেশ কয়েকটা বছর লেগে গেলো! লম্বা ডিলিড্যালি শেষে অবশেষে ওয়েবের জন্য আমার প্রথম কাজটা করতে যাচ্ছি!’

 

 

নির্মাতা আশফাক নিপূণ জানান, ওটিটির প্রভাব ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বের ইন্ডাস্ট্রিতে পড়ে গেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন হলিউডের প্রখ্যাত নির্মাতা মার্টিন স্করসিজ, স্টিফেন স্পিলবার্গরাও এখন ওটিটির জন্য কাজ করছেন। অস্কারে প্রতিযোগিতার জন্য কেউ কেউ ১০-১৫ দিনের জন্য হলে মুক্তি দিলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ওটিটি দর্শকের কাছে পৌঁছানো।

আশফাক নিপুন

জনপ্রিয় এই নির্মাতা বলেন, ‘ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আমিও কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে ‘হইচই’ এ মুক্তি পাওয়া ‘কষ্টনীড়’; আমার প্রথম ওয়েবফিল্ম। একই প্লাটফর্মের জন্য এখন নির্মাণ করছি ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’। আমাদের এই হলকেন্দ্রিক ভঙ্গুর ইন্ডাস্ট্রির বিপরীতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছি আমি। কাকরাইলের হাতেগোনা কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটির এবং জাজ মাল্টিমিডিয়ার হাতে বন্দি ইন্ডাস্ট্রির বিপরীতে এই নতুন প্লাটফর্মে নির্মাতা, প্রযোজকেরা সরাসরি ডিল করতে পারছে। একইসাথে বিশ্বজুড়ে ডিস্ট্রিবিউট করার অপশনও পাচ্ছে হাতে। এছাড়া সেন্সর বোর্ডের কাঁচির ভয়ও নেই এখানে।’

দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকে দেশের গন্ডি ছেড়ে গ্লোবালি কাজ শুরুর পরামর্শ দিয়ে এই নির্মাতা বলেন, ‘বিজ্ঞাপন কেন্দ্রিক ভিউয়িং স্ট্র‍্যাটেজির বাইরে গিয়ে সাবস্ক্রিপশন কেন্দ্রিক ভিউয়িং এ জোর দিলে আমাদের সিনেমাগুলোও বিশ্বপরিসরে জনপ্রিয় হতে শুরু করবে।’

শাওকি সৈয়দ

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এযাবতকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রশংসিত বাংলাদেশী ওয়েব সিরিজ ‘তকদীর”। ‘হইচই’ এ মুক্তি পাওয়া এই সিরিজের নির্মাতা সৈয়দ আহমেদ শাওকি মনে করেন শুধুমাত্র হল বন্ধ কিংবা ভেঙ্গে ফেলার সাথে ওটিটি মার্কেট এর জনপ্রিয়তা বাড়ার তেমন শক্ত কোনো সম্পর্ক নেই।

শাওকি বলেন, ‘পৃথিবীর অন্য অনেক দেশেই হল ভাঙছে না, লকডাউনের আগে যখন সবই স্বাভাবিক ছিলো তখনও সেসব জায়গায় হল ব্যবসার সাথে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ওটিটি, গণমানুষও হলের চাইতে বেশি প্রেফার করেছে ওটিটি। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের বাস্তবতায় হল ভেঙ্গে ফেলা কিংবা হলের সংখ্যা কমার কারনে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি অনেক বেশিই হচ্ছে কিন্তু ওয়েব কন্টেন্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়।’

চলচ্চিত্র বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ম্যাজিক লন্ঠন’- এর সহযোগী সম্পাদক ‘ইব্রাহীম খলিল’ বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা গত কয়েকবছর ধরেই বেশ নাজুক। এর মধ্যেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো বেশ শক্ত একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। আমাদের দেশি ওটিটি প্ল্য্যাটফর্মগুলোতে বিনিয়োগের অভাব, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং পরিকল্পনাগত মেধার অভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জি ফাইভ, হইচই, আড্ডাটাইমস। আর অদূর ভবিষ্যতে বিদেশী প্ল্যাটফর্মের চেয়ে দেশি প্ল্যাটফর্ম এগিয়ে যাবে- এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।’

ইব্রাহীম খলিল

ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই পর্যবেক্ষক বলেন, ‘সবমিলে নয়াবাস্তবতার চলচ্চিত্র জগত মাথা চাড়া দেওয়ার কারণে এতোদিন দেশে হলকেন্দ্রিক যে ভঙ্গুর ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে ছিলো সেটাও এই লকডাউনের প্রভাবে মরতে বসেছে প্রায়। শত-শত হল চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, যে কটা টিকে আছে সেগুলোর ভবিষ্যতও অন্ধকার। তাই আমার মনে হয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো এসে আমাদের হলকেন্দ্রিক বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতিই করে গেলো’।

লেখক পরিচিতি

সিজু খান
সিজেএমবি'র শিল্প সম্পাদক ও নির্মাতা।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত