গণতন্ত্র কেন জরুরি?

গত ২০২০ এর নভেম্বরের কথা। অনলাইনে একটা পলিসি মেকিং গ্রুপে পোলের মাধ্যমে জরিপ করা হচ্ছিল। প্রশ্ন ছিল, “বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়িত হয়েছে কোন মূলনীতিটি?”। চারটা অপশন ছিল, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। অনেকেই সেখানে এমনভাবে ভোট দিয়েছিলেন, যেন গণতন্ত্রের চেয়েও অন্যান্যগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  আবার ইদানিং অনেকের লেখা দেখে মনে হয়, তারা এরকম প্রশ্ন করার চেষ্টা করেন যে, গণতন্ত্র থেকে লাভ কী, যদি শাসক পরিবর্তন করা না যায়? তারপর অনেকে আবার বলেন যে, যদি ধর্মনিরপেক্ষতা না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র দিয়ে লাভ কী? অনেকে বলেন যে, সমাজতন্ত্র ছাড়া গণতন্ত্র আসলে বুর্জোয়াদের গণতন্ত্র।

তো পাঠকের কাছে কিছু প্রশ্ন থাকবে আমার। আপনারা কি কখনও ভেবেছিলেন যে, গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র কেমন হতে পারে? কিংবা গণতন্ত্র ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষতার বুলিই বা কেমন? অথবা ভাবুন যে, আপনি একটা একনায়কতান্ত্রিক ইসলামিক রাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেটাই বা কেমন হতে পারে?

আসলে গণতন্ত্র বলতে আমরা এতদিন যা বুঝে এসেছি, সেসব ফেলে দিয়ে গণতন্ত্রকে ‘গণক্ষমতাতন্ত্র’ হিসেবে ভাবতে শুরু করতে হবে।

‘গণক্ষমতাতন্ত্র’ কী? এতদিন গণতন্ত্র বলতে  বিমূর্ত একটা ধারণা সবারই হয়তো ছিল। আব্রাহাম লিংকনের কথামতো, ” জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার” এটাই ছিল মোটাদাগে গণতন্ত্রের ধারণা। কিন্ত সেটা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে আমাদের মতো আমজনতার খুব বেশি মাথাব্যথা ছিল না।

আসলে জন্ম-জন্মান্তরে আমাদের উপনিবেশিত মনস্তত্ব কখনও নিজেদের অধিকার নিয়ে স্বনির্ভর চিন্তাভাবনা করতে পারেনি, নানান হেজেমনির পাকে পড়ে, নানান অত্যাচার-নিপীড়নের মাঝে তাদের স্বনির্ভর-স্বাধীন হওয়ার চিন্তাভাবনা হারিয়ে গেছে।

এখন আসলে সময় এসেছে, নিজেদের অধিকার নিয়ে ভাবার। তো, গণতন্ত্র কথাটা খানিকটা বিমূর্ত হলেও, ‘গণক্ষমতাতন্ত্র’ কথাটা আপনি যখন উচ্চারণ করেন, তখন আপনার চাহিদার খানিকটা বাস্তবিক গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

গণক্ষমতাতন্ত্র মানে আসলে তখন আন্দাজ করে নেওয়া যায় যে, ক্ষমতাটা থাকবে গণ’র কাছে। এই গণ কারা? এই গণ আপনি, এই গণ আমি, এই গণ পাড়ার সেই রিকশাওয়ালা, এই গণ একজন মেথরও। এই গণ একজন পাহাড়ি, মুসলমান, হিন্দু, সাঁওতাল কিংবা খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-জৈন। এই গণ একজন হিজড়া, এই গণ একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। এই গণ একজন কালো মানুষ, কিংবা একজন সাদা মানুষ। এই গণ মানে সব মানুষ।

তার মানে ক্ষমতা আমার হাতে মানেই কি আমি যা খুশি তাই করার ক্ষমতা রাখবো? না। কারণ এই গণক্ষমতাতন্ত্র মানে আপনার হাতে যেমন ক্ষমতা, আপনার হাতে দায়িত্বও। আপনি এই ক্ষমতা পাওয়ার ক্ষেত্রে কারো চেয়ে বেশিও পাবেন না, কারো চেয়ে কমও না। আবার এই ক্ষমতাকাঠামোয় আপনাকে আপনার সমস্ত কাজের জন্য বাকি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। অর্থাৎ, আপনি কোন কিছু করে পার পেয়ে যাবেন না, বাকি জনগণের ক্ষমতা থাকবে আপনাকে আটকানোর। মূলত গণতন্ত্র বলতে এটাই বুঝায়। গণতন্ত্র হলো সেই সরকার ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে আপনার ক্ষমতা আর আপনার রাষ্ট্র-প্রধানের ক্ষমতা, আর আপনার বাড়ির পাশের চায়ের দোকানদারের ক্ষমতায় কোন পার্থক্য থাকবে না। সবারই সমান ক্ষমতা, সমান রেসপন্সিবিলিটি।

তাহলে সেটা কীভাবে সম্ভব? গণতন্ত্র কি কোন ব্যক্তির উপর নির্ভর করে যে, সে এসে ভালো করে দিলেই ভালো হবে?  নাকি নির্দিষ্ট কোনও মতাদর্শের উপর নির্ভর করে গণতন্ত্র আসবে? এমন কোনও মতাদর্শ কি আছে, যেখানে গণতন্ত্র ইনবিল্ট আকারে থাকে?

বাস্তবতা হচ্ছে, গণতন্ত্র কোনও মতাদর্শেই ইনবিল্ট আকারে থাকে না৷ আসলে গণতন্ত্র হচ্ছে, একটা পদ্ধতি, যেটা কিনা ক্রমাগত চর্চা করে যেতে হয়। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়, একইভাবে স্বাধীনতার জন্যও গণতন্ত্র থাকতে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন মতাদর্শ সেই স্বাধীন কিংবা পরাধীন জনগণের মাঝে প্রয়োগ করার কিছু ধারণা ছাড়া আর কিছুই না।

আপনারা জানেন যে, প্রায় দুইশ’ বছর আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন উপনিবেশিক শক্তি শাসন-শোষণ করে গেছে। উপনিবেশিক শক্তিগুলো শুধু শাসন কিংবা শোষণ করে গেছে এমন না, তারা এর চেয়েও বেশি করে গেছে। তারা শাসন-শোষণ তো করেছেই, এর সাথে সাথে শাসন-শোষণকে বৈধ করার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি করেছে নানান কায়দায়। এখানে তারা শাসন-শোষণের জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি করে গেছে। সাতচল্লিশে আর একাত্তরে উপনিবেশিক শক্তিগুলো বিদায় নিয়েছে এই ভূখণ্ড থেকে, কিন্ত শাসকই শুধু পাল্টেছে, শাসন-শোষণ কোনটারই অবসান ঘটেনি।

এইসব উপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের শাসন-শোষণের বৈধতা দেওয়ার জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। তারপর তারা শাসন-লুটপাট চালিয়ে ইচ্ছেমতো আইনি বৈধতা নিয়েছে সেই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। কেবল আইনি কাঠামো নয়, ব্রিটিশরা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবর্তনটা করেছে আমাদের সংস্কৃতিতে। আজ দুইশ’ বছর পরে আমাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাসন-লুটপাটের চিত্র দেখলে বোঝা যায় যে, শুধু শাসকই পরিবর্তিত হয়েছে, শাসন-লুটপাটের অবসান ঘটেনি, বরং এইসব শাসন-লুটপাটের জন্য যে গণসম্মতি দরকার হয়, সেটাও তারা পেয়ে যায় আমাদের উপনিবেশিত আইনকাঠামো আর উপনিবেশিত সংস্কৃতির কারণে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এইসব উপনিবেশিক শক্তিগুলো কোনকালেই এই উপমহাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা করেনি। যদিও তাদের আইন-কাঠামোতে অনেক ভালো ভালো কথার উচ্চারণ ছিলই।

আমাদেরকে তাই সবার আগে নিজেদের উপযোগী আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে। এই কাঠামোতে গণতন্ত্র থাকা সবচেয়ে জরুরি। না, কাগুজে আলাপের গণতন্ত্র না। বাহাত্তরের পরের যে সংবিধান, সেখানে নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র সবই ছিল, বাস্তবে সেই গণতন্ত্র নানা শর্তজালে বন্দী হয়ে আছে। সেই শর্তজালগুলো ছিন্ন করতে হবে। গণতন্ত্র হতে হবে নিঃশর্ত। এখানে সরকারগুলো থাকবে, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে।

এখনকার সরকারও নামকাওয়াস্তে জনগণের কাছে দায়বদ্ধই, কিন্ত সেটা নানা শর্তে বন্দী। কোনও কারণেই কোনভাবেই রাষ্ট্রপ্রধানকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়া থেকে রেহাই দেবে না। এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। মোট কথা, সরকার তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের জন্য  সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে, এরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। আর সেটার জন্য জনগণকেও গণতন্ত্র চর্চার দিকে যেতে হবে।

রাষ্ট্রের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এরকম নানান গালভরা নামওয়ালা মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্ত আপনার রাষ্ট্রের কার্যকলাপে সেসব মূলনীতির বাস্তবায়ন সম্ভব না, যদি না কার্যকর গণতন্ত্র থাকে৷ আপনার রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে কিনা বাস্তবে, তার জন্য আপনি কাকে জবাবদিহি করবেন? রাষ্ট্রপ্রধানকে আপনি জবাবদিহি করতে পারবেন তখনই, যখন রাষ্ট্রটা প্রকৃত অর্থেই গণতান্ত্রিক হবে। আপমার রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক কিনা, তা আপনি আমজনতা হিসেবে কাকে জবাবদিহি করবেন? আপনার রাষ্ট্রে একজন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, আস্তিক, নাস্তিক, সকলেই তার অধিকারের বেলায় সমান অধিকার পাচ্ছে কিনা, আপনার রাষ্ট্রে মুসলমান হিসেবে আপনার অধিকার কম কিনা, নাস্তিকদের মেরে ফেলা হচ্ছে কেন, এরকম নানামুখী প্রশ্ন নিয়ে আপনি আপনার রাষ্ট্রের সরকারকে জবাবদিহি করতে পারবেন তখনই, যখন আপনার রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কার্যকর থাকবে। তাই, দরকার আসলে গণতন্ত্র।  গণতন্ত্র আপনার রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করুন, তারপরেই কেবল বাকি অন্যান্য সূক্ষ্ম অধিকারের প্রশ্ন ভ্যালিড হবে। মানুষ যেন এই গণতন্ত্রের মূল আলাপে যেতে না পারে, যেন শাসনপ্রণালীর গোড়ার সংকটগুলো নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত না হয়, সেজন্যই রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীরা কিছুদিন পরপরই নানান বিতর্ক তোলে, আলাপ করে যা আমাদের সামগ্রিক মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টই নয়। আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক, ভাষ্কর্য নিয়ে বিতর্ক, ধর্ষণ বিতর্ক; নানান কায়দার এসব বিতর্কে কেবল মানুষের সময় ও শ্রম নষ্টই হবে, বিতর্ক শেষ হবে না। এরকম বিতর্কে অংশগ্রহণ না করে কার্যকর আলাপে অংশগ্রহণ করা জরুরি। এই মুহুর্তের কার্যকর আলাপ হচ্ছে, কীভাবে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা যায়। আসুন, সেই আলাপের সূচনা করি।

লেখক পরিচিতি

মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুম
মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুমের জন্ম বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। ছোটবেলায় কওমি মাদ্রাসায় হাফেজ হয়েছিলেন। এরপর শিবগঞ্জ পাইলট হাইস্কুল থেকে এসএসসি ২০১৭ সালে আর বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি ২০১৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ক চিন্তা ও চর্চার পাশাপাশি অবসর সময়ে বই গান, সিনেমা এসব নিয়েই থাকেন।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত