নাগরী লিপি; এক বহতা ঐতিহ্য-গাথা

বরাক-সুরমা নদী বিধৌত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেটের অবস্থান। ‘সিলোটি’, ‘সিলটি’ ইত্যাদি নামের ভাষায় এখানকার অধিবাসীরা কথা বলেন। এ ভাষাভাষী মানুষেরা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ ছাড়াও রয়েছেন ভারতের আসাম প্রদেশের বরাক ভ্যালিতে ও সুদূর ইংল্যান্ডে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সিলেট ও বরাক এলাকার ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন। এ ভাষার সঙ্গে অহমিয়া ও পূর্ব বাংলার কথ্য ভাষারীতির মিল রয়েছে; এর একটি বৈশিষ্ট্য হলো এতে অসংখ্য ফার্সি ও আরবী শব্দের মিশেল রয়েছে। ব্যাকরণের দিক থেকে সিলেটি ভাষা এর নিজস্ব নিয়ম কানুন মেনে চলে।

এক সময় সাধারণের ভেতর প্রবাদ ছিল, ‘নাগরী লিপি আড়াই দিনেই শেখা যায়’। এ-ও শোনা যায় যে, এই লিপি চর্চায় পুরুষদের চেয়ে নারীরাই অগ্রগামী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা ভাষা শিক্ষা ছাড়াও অনেকে নাগরী লিপিতে নাম দস্তখত করতে পারতেন।

তিনটি বিষয় সিলেটি ভাষাকে এর স্বকীয়তা এনে দিয়েছে, নাগরী লিপি এ অঞ্চলের কথ্য ধ্বনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লিপিমালাটি বাংলার চেয়েও সহজ, কারণ এতে অক্ষর রয়েছে ৩২টি, যেখানে বাংলা বর্ণমালার বর্ণসংখ্যা ৪৯ টি। দ্বিতীয়ত, এটি কোনোভাবেই বাংলা ভাষার ‘আঞ্চলিক’ কোনো অপভ্রংশ নয়। তৃতীয়ত, সিলেটি বাংলাদেশ ও আসাম রাজ্যে ব্যবহৃত এমন একটি ভাষা যার নিজস্ব সাহিত্য সম্ভার রয়েছে। সর্বোপরি এর নিজস্ব বর্ণমালা আছে যেটি ‘সিলেটি নাগরী’, ‘ফুল নাগরী’, ‘মোহাম্মাদী নাগরী’ এরকম নানাবিধ নামে পরিচিত। এ লিপির উৎস নিয়ে আলোকপাত করা দুরূহ। নাগরী লিপির উৎপত্তি ও এর বিকাশকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মত-পার্থক্য রয়েছে।

বর্ণমালা 

নাগরী লিপির বর্ণমালা আলোচনা করার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে এর তুলনা চলে আসে। 

সিলেটি নাগরী লিপি এ অঞ্চলের কথ্য ধ্বনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বলতে গেলে এ বর্ণমালাটি বাংলার চেয়েও সহজতর, কারণ এতে অক্ষর রয়েছে ৩২টি। এ লিপিতে রয়েছে যুক্তবর্ণের নূন্যতম ব্যবহার।

এতে রয়েছে মোট ৫টি স্বরবর্ণ ও ২৭টি ব্যঞ্জনবর্ণ। ধ্বনি-নির্দেশক চিহ্ন রয়েছে ১টি। স্বরবর্ণ ৫টি হচ্ছে—আ, ই, উ, এ, ও। ব্যঞ্জনবর্ণ ২৭টি হচ্ছে—ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, র, ল, শ, হ, ড়। ভাষা গবেষকেরা এই ৩২টি অক্ষরের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা লিপির প্রভাব লক্ষ্য করেছেন।

দেবনাগরী লিপির সঙ্গে সিলেটি নাগরী বর্ণের মিল রয়েছে ১৮টি বর্ণের, বঙ্গলিপির ৬টি, কাইথি লিপির ৮টি। ৮টি বর্ণ একান্তই নাগরী লিপির নিজস্ব বা মৌলিক বর্ণ। এসব অক্ষর লেখার ভঙ্গি বাংলা অক্ষর থেকে ভিন্নতর।

আগেই বলা হয়েছে, এ লিপির বর্ণ সংখ্যা ৩২টি, অন্যদিকে বাংলা ভাষার বর্ণমালায় এ সংখ্যা ৪৯টি। জটিলতা পরিহারের জন্য অনাবশ্যক বিবেচনায় বাংলা ভাষার ১৭টি বর্ণ পরিহার করেছেন প্রবর্তকেরা। ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী তারা একটি নির্দিষ্ট ধ্বনির জন্য একটি বর্ণ নির্বাচন করেছেন। যেমন, ‘ই’ ও ‘ঈ’ দুটোর পরিবর্তে একটি ‘ই’ হয়েছে, তেমনি ‘উ’ ও ‘ঊ’ পরিবর্তে একটি ‘উ’ রাখা হয়েছে। ‘ন’ এবং ‘ণ’ এর মধ্যে একটি ‘ন’ ব্যবহার করেছেন। বাংলা ভাষার অন্যতম জটিলতা রয়েছে তিনটি অক্ষরে—শ, ষ, স। নাগরী লিপিতে কেবল ‘শ’-কে রেখে বাকি দুটোকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ লিপি থেকে যেসব বর্ণ বাদ পড়েছে, সেগুলো হচ্ছে—অ, ঈ, ঊ, ও ঋ, ঐ, ঔ, ঙ, ঞ, ণ, য, ষ, স, য়, ঢ়, ং, ঃ , ঁ।

প্রায় দুই শতাধিক যুক্ত বর্ণ সম্বলিত বাংলা বর্ণমালার একটি জটিল ক্ষেত্রের নাম হলো যুক্তাক্ষর। নাগরী লিপিতে যুক্তাক্ষরের সংখ্যা মোটে ১৬টি। ছয় শ’ বছর আগে এ লিপির উদ্ভাবকের লিপিটিতে সংস্কৃতিবহুল বঙ্গলিপির জটিলতা পরিহার করতে সচেষ্ট ছিলেন। সে সময়ে এ লিপি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাবহারকারীর কাছে এই লিপি শেখাটা সহজবোধ হতো। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছাড়াই সহজাতভাবে লিপিটি এ অঞ্চলের মুসলিম অধিবাসীর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে; আগ্রহীরা একজন অন্যজনের কাছ থেকে দুই-আড়াইদিনের ভেতরেই লিপিটি শিখে নিতেন।

ছয় শ’ বছর জুড়ে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ লিপিতে রচিত হয়েছে শত শত সাহিত্য, গ্রন্থ, দলিল, চিঠিপত্র। সিলেট বিভাগ ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, ভৈরব, করিমগঞ্জ ও ভারতের শিলচরে এর নিয়মিত ব্যবহার ছিল। সে সময় এটি ব্যবহৃত হত বাংলা লিপির বিকল্প হিসেবে। এখন পর্যন্ত এতে লেখা প্রায় দুই শতাধিক পুঁথির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। বিশাল এ সাহিত্যের চুম্বক অংশ ইসলাম ধর্মের চর্চা বিষয়ে রচিত; তাছাড়াও কয়েকটি প্রণয় কাহিনি, কিছু সামাজিক কাহিনিনির্ভর পুঁথি, ও জীবনের আখ্যানমূলক পুঁথির সুলুক-সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে।

সিলেটি নাগরী লিপি

লিপির উৎস সন্ধান

এ লিপির উৎস নিয়ে আলোকপাত করা দুরূহ। নাগরী লিপির উৎপত্তিকাল ও এর বিকাশ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মত-পার্থক্য রয়েছে। তৎকালীন সিলেটের মুসলমানরা আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপির সমন্বয়ে বিশেষ ধরনের একটি লিপির উদ্ভাবন করেছিলেন, এটিই ছিল সিলেটি নাগরী। সে সময়ের শ্রীহট্টের মুসলিম সাহিত্যিকরা হিন্দি ও সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলার পরিবর্তে নাগরী লিপিতে তাদের ধর্মীয় সাহিত্য চর্চা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ধারণা করা হয়, হজরত শাহজালাল (র.) এর সমসাময়িক মুসলিম ধর্মপ্রচারকেরা এই লিপির প্রসার ঘটিয়েছিলেন।

এ পর্যন্ত সর্বপ্রাচীন যে পুঁথিটি পাওয়া গিয়েছে তার নাম ‘তালিব হুসন’; এর লেখক গোলাম হুসন উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে পুঁথিটি রচনা করেছেন। এ লিপিতে সিলেটি ভাষার যে ধরণটি ব্যবহার করা হয়েছে তা সে সময়ে এ এলাকায় প্রচলিত ছিল। অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর মতে, গোলাম হুসন তাঁর ৮১ বছর বয়সে পুঁথিটির রচনা শুরু করেন এবং পাঁচ বছর পর ১৫৫৫ সালে শেষ করেন।

মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৪৩)  লিখেছেন, ‘আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সেইকালে শ্রীহট্টের ভাষা ছিল সংস্কৃতবহুল বাঙ্গালা। বিদেশাগত মুসলমানগণ উত্তরকালে এদেশের ভাষাকে নিজ ভাষা রূপে গ্রহণ করিলেও প্রথমাবস্থায় তাঁহারা তাহা সাম্যক রূপে বুঝিয়া উঠিতেন না। অপরপক্ষে নবদীক্ষিত মুসলমান ও হিন্দু ভাতৃগণ, শাসক ও প্রতিবেশী বিদেশাগত উর্দ্দু, পার্শি মিশ্রিত ভাষা বুঝিতে সক্ষম হইতেন না। দেশের শাসন ও ধর্ম্মপ্রচার কার্য্য চালাইতে গিয়া হিন্দুদের সহিত কথা কহিতে মুসলমান শাসক ও ধর্ম্মপ্রচারক সম্প্রদায়ও বিশেষ অসুবিধা ভোগ করিতেন। আমাদের বিশ্বাস নানা ভাষার সংমিশ্রণে তখনকার শ্রীহট্টের ভাষা এক অপূর্ব আকার ধারণ করিয়াছিল। অতঃপর শাসকগণের গবেষণায় এতদ্দেশীয় হিন্দুগণের রাজকার্জ ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের ধর্ম্মকার্য্য ও রাজকার্য্য পরিচালনের সুবিধার্থে সর্ব্বসাধারণের বোধগম্য করিয়া এক সহজ সরল (গ্রাম্য) ভাষার পরিচালনাহেতু বাঙ্গালা ও দেবনাগরী অক্ষরের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া ‘সিলেট নাগরী’ অক্ষরের সৃষ্টি হয়। সহজ ও সুন্দর বলিয়া জনসাধারণ ইহার অপর এক নাম দিয়াছিলেন সিলেটের ‘ফুল নাগরী’।’

সিধাসাধা লিপি হওয়ায় অল্প সময়ের ভেতরেই লিপিটি মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন—১৯১৭ সালে প্রকাশিত ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে অত্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি বলেছেন, ‘শ্রীহট্টের মুসলমানদের মধ্যে একরূপ নাগরাক্ষর প্রচলিত আছে। অনেক মুসলমানি কেতাব এই অক্ষরে মুদ্রিত হয়। এই ভাষা (বর্ণ) অতি সহজে শিক্ষা লাভ করা যায়।’

এখানে দ্রষ্টব্য বিষয়টি হলো নাগরী লিপি মূলত মুসলমানি ভাষা লিপি ছিল। হিন্দু অধিবাসীগণ এই বাংলা লিপির সাথে সচরাচর পরিচিত ছিলেন না। এ বিষয়ে ‘সোনাভানের পুঁথি’তে বলা হয়েছে, ‘এই লিপির ব্যবহার প্রধানত সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হিন্দুরা এই লিপির সঙ্গে মোটেই পরিচিত নন। সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চলে—সদর, করিমগঞ্জ ও মৌলভীবাজার মহাকুমায় এই লিপির প্রচলন বেশি ছিল। কাছাড় জেলায় ও ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহাকুমায়ও একসময়ে সিলেটি নাগরী পুঁথির প্রচলন ছিল।’

অন্যদিকে ‘সোনাভানের পুঁথি’তে নাগরী লিপির উৎপত্তি নিয়ে বলা হয়েছে, ‘পলাশীর যুদ্ধের পর যখন এদেশ থেকে ফারসি ও উর্দূ ভাষার চর্চা উঠে গেল, তখন সাধারণ মুসলমানরা বাংলা সাহিত্যে নজর দিল। তারা দেখতে পেল বাংলা লিপি—বিশেষত সংযুক্ত বর্ণ অত্যন্ত জটিল। একে তো সিলেটের কথ্যভাষা নদীয়া শান্তিপুরের সাধুভাষা থেকে অনেক পৃথক, তদুপরি সংস্কৃত শব্দের বাহুল প্রয়োগ নিমিত্ত ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের সাধুভাষা মুসলমানদের কাছে একেবারে দুর্বোধ্য মনে হইলো। কাজেই বাধ্য হয়ে তারা নিজস্ব লিপি ও সাহিত্য সৃষ্টি করতে অগ্রসর হলেন।’

দেখা যাচ্ছে যে, সিলেটি নাগরী লিপির উদ্ভব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত চালু রয়েছে। গবেষককদের এসব মতামতকে তিনটি পক্ষে বিন্যস্ত করলে দেখা যায় যে প্রথম পক্ষ অনুযায়ী নাগরী লিপির উদ্ভব হয়েছে চর্তুদশ শতকের গোড়াতেই। হজরত শাহজালাল (র:) এবং ৩৬০ আউলিয়ার মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার লাভ করে। এ মতানুসারে এই আউলিয়াদের অনুসারীরা এ নাগরী লিপি সৃষ্টি করেন।

অন্যদিকে দ্বিতীয় পক্ষ মনে করে, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এ অঞ্চলে আফগান উপনিবেশ স্থাপিত হয়। এ সময় তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় লিপিটির উদ্ভব ঘটে। এর প্রমাণ হিসেবে আফগান মুদ্রায় নাগরী লিপির অক্ষরের উপস্থিতি পেশ করেন তারা।

তৃতীয় পক্ষের ধারণা হলো, তৃতীয় পক্ষের ধারণা হলো, ব্রিটিশ শাসনের সময়ে এ লিপির উৎপত্তি, যুক্তি হিসেবে তারা বলেন যে, ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে এবং হিন্দুদের প্রভাব মুক্ত থাকার জন্য এই লিপির আশ্রয় গ্রহণ করে। এই তিন ধারার মতামতের মধ্যে হজরত শাহজালালের (র:) সময়ে এই লিপির উদ্ভব হয়েছে বলেই অধিকাংশ ভাষাবিদ মতামত দিয়ে থাকেন, কেননা তাঁর সময়েই এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে গভীরভাবে ইসলামিক প্রভাব দেখা যায়। 

লিপির বিস্তার

রাজকার্য পরিচালনার সঙ্গে এই লিপি ব্যবহারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না কখনো। বস্তুত নাগরী লিপিতে রচিত গ্রন্থের পুরোভাগে জীবন-ঘনিষ্ঠ সাহিত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলো ইসলামি মারফত ও সুফী চিন্তাভাবনা প্রসূত গ্রন্থাদি যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ, ইসলামি জীবনব্যবস্থা, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে রচিত। কিছু পুঁথিতে পীর ও আউলিয়াদের জীবনী লিখিত হয়েছে, আবার কিছু পুঁথিতে রয়েছে প্রেম-উপাখ্যান। সৈয়দ শাহনূর, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, শাহ আরমান আলী, শাহ আবদুল ওয়াহাব চৌধুরীর প্রায় সব রচনাই সুফী ঘরানার ধর্মীয় আবেগরসে জড়িত। নাগরী লিপির সবচেয়ে জনপ্রিয় পুঁথি মুন্সী সাদেক আলী রচিত ‘হালতুন্নবী’। পুঁথিটি ১৮৬০ সালে মুদ্রিত হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে নাগরী লিপি সিলেট ছাড়াও এর সংলগ্ন এলাকায়ও ব্যাপ্ত ছিল। মুদ্রণজনিত কারণে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল কলকাতা, শিলং প্রভৃতি স্থানে। পণ্ডিতদের লেখা থেকে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় এই লিপির ব্যাপ্তি ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় নাগরী লিপি সিলেট সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও দূরবর্তী অঞ্চল যেমন: বরিশাল, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি প্রভৃতি অঞ্চলেও ব্যাপৃত ছিল। শ্রীপদ্মনাথ দেবশর্ম্মা’র বিবরণী থেকে পাওয়া যায় : ‘পূর্ব্বে এই অক্ষর শ্রীহট্ট সহরের আশে পাশে প্রচলিত ছিল। ছাপার পর এইক্ষণে শ্রীহট্ট জেলার সমগ্র, কাছাড়, ত্রিপুরা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অর্থাৎ পদ্মার পূর্ব্বদিকে বঙ্গভূমির সর্ব্বত্র এই অক্ষর মোসলমান জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে।’ চট্টগ্রাম ও বরিশালে লিপির ব্যাপ্তি হয়েছে নৌপথের যাত্রীদের মাধ্যমে—এমন ধারণাও অনেকে পোষণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে সিলেটের প্রচুর যুবা যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর মাধ্যমে সেখানেও এ লিপি জানা মানুষেরা রয়ে গিয়েছেন।

বিস্মৃতি

ঐতিহ্যবাহী নাগরী লিপির চর্চা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলো তার কারণ সন্ধানে প্রথমত বলা প্রয়োজন যে, একদা নাগরী লিপি এ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিকে লালন করে প্রসারতা পেয়েছিলো। সিলেট ও আসামের বরাক ভ্যালি এ লিপির প্রচলনকাল, তথা মুঘল আমলের পর থেকে যে ধরণের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিবর্তনের মাঝে দিয়ে পার করেছে তা নিজেই এক সুদীর্ঘ আলোচনার বিষয়। চারিত্রিকভাবে এ ভাষাটি বঙ্গালা উপভাষার মতো নয় মোটেও, এটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র উপভাষা। সুনির্দিষ্টভাবে সিলেটের এই জনপদে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা এ লিপি রীতির সঙ্গে তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক স্রোতের সম্পৃক্ততা না থাকায় এ ভাষার ব্যবহারকারীগণ লিপিটির চর্চা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন।

এ লিপি ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে ব্রিটিশ রাজের অন্তে, যখন ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলমানদের মতোই সিলেটের মুসলমানেরা ইংরেজি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। সে সময় এখানকার মুসলমানেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির আশায় ব্যাপকভাবে বাংলা ও ইংরেজি শিখতে শুরু করে। ব্রিটিশের পর পাকিস্তানি আমলে শুধু সিলেট কেন, তাবৎ পূর্ব বাংলার ভাষা-সংস্কৃতি ভয়াবহ ধরণের আগ্রাসনের শিকার হয়। নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাড়নায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাংলা ও উর্দু ভাষার প্রচ্ছন্ন প্রভাবে এ লিপির স্রোতটি শীর্ণকায় হয়ে নিজের অজান্তেই তার আবেদন হারিয়ে ফেলে।

নাগরী লিপির ওপর সর্বশেষ ধাক্কাটি লাগে ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিরা সিলেটি নাগরী লিপির একমাত্র ছাপাখানাটি বিধ্বস্ত করে দেয়। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর সিলেটি ভাষাটি ঘরোয়া পরিবেশে ও সামাজিক মেলামেশার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। থেমে যায় এ লিপিতে লেখার ছয় শ’ বছরের ঐতিহ্য।

মুদ্রণের ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা সমূহের মাঝে সিলেটি নাগরীর স্থান বৈশিষ্ট্যময়। মুদ্রণখানার প্রচলনের আগেই এর প্রিন্টিং ফন্ট তৈরী করা হয়, পরবর্তীকালে মুদ্রণযন্ত্র আসার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রচার ও প্রসারে গতি আসে। বাংলা ও অহমিয়া ভাষার সাথে এখানে এ লিপির পার্থক্য তৈরী হয়, কারণ এ দুটো ভাষার ছাপানোর প্রারম্ভে ইউরোপীয়ানদের প্রভাব ও অবদান ছিল।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সিলেটের গ্রামাঞ্চলে সাক্ষরতার প্রচলন ছিল। এ রকম বেশ কিছু হাতে লেখা পুঁথির পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে, এরকম দুটো পুঁথি হলো ‘শাহাদতে বুজুর্গান’ এবং ‘গাফিল নসিয়ৎ’। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে মৌলুভী আব্দুল করিম বেশ কিছু বছর ইউরোপে অবস্থান করেন, তিনি সেখানে মুদ্রণ সংক্রান্ত কাজ শেখেন। দেশে ফিরে কাঠের ব্লক দিয়ে সিলটি নাগরীর বর্ণমালা খোদাই করেন এবং ১৮৭০ সালে বন্দর বাজারে ‘ইসলামিয়া প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন।

কাঠের ব্লকের পর মেটালের টাইপিং এর প্রচলন ঘটে এবং সিলেটি নাগরিরই প্রেস সুনামগঞ্জে ও শিলংয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতা শহরে এক সময় তিনটি সিলেটি নাগরির ছাপাখানা ছিল, কমপক্ষে একটি পত্রিকা এ ভাষায় ছাপানো হতো। কারণ হিসেবে দেখা যায়, বহুসংখ্যক সিলেটি যুবকে ভাগ্যের অন্বেষণে কলকাতায় যেতেন জাহাজে কাজ করার জন্য এবং কলকাতায় কাজ পাবার জন্য। অথবা জাহাজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে তারা নিজেদের ভাষায় পড়াশোনা করে অলস সময় কাটাতেন।

বর্তমান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে সিলেটের তরুণেরা ব্যাপকভাবে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। এখন বিলেতে তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের সিলেটি-ব্রিটিশ সন্তানেরা জন্ম নিচ্ছেন। তারা বাংলা ভাষা বলতে বস্তুত সিলেটি ভাষাকেই জানেন। সিলেটি নাগরী লিপি পুনর্বার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই প্রবাসী সিলেটি জনগণের বিশেষ অবদান রয়েছে।

১৯৯৭ সালে ‘ষ্টার’ নামের ইংল্যান্ডভিত্তিক একটি সংগঠন কাঠের ব্লকে করা নাগরীর হরফের নমুনা থেকে একটি বেসিক কম্পিউটার ফন্ট তৈরী করে। এতে আগ্রহ তৈরী হওয়ায় সে বছরই ‘ষ্টার’ সিলটি নাগরীর কম্পিউটার ফন্ট তৈরি করে; যার নাম হলো ‘নিউ সুরমা’। এখন নাগরী লিপির বেশ কিছু এন্ড্রয়েড অ্যাপ রয়েছে। লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটি বিপন্ন এ লিপিটি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করছে।

এ লিপিতে রচিত সিলেটি সাহিত্য জনপ্রিয় করতে সিলেটের ‘উৎস প্রকাশন’ কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানটি ২৫টি গ্রন্থের ‘নাগরী গ্রন্থসম্ভার’ উপস্থাপন করার পর নতুনভাবে এ লিপি পাঠকদের কাছে চলে আসে। ফলশ্রুতিতে ঐতিহ্যবাহী এ লিপি সম্পর্কে আকর্ষণ অনুভব করেন ভাষাপ্রেমিকেরা। এ অতুলনীয় সম্ভার রক্ষায় একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠাসহ নানাবিধ উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে। সিলেট শহরে নাগরী লিপি চত্বর প্রতিষ্ঠা এবং সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাগরী ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নাগরী পাঠশালা।

পরিশেষে

ছয় শ’ বছর আগে জন্ম নেওয়া নাগরী লিপি বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ। এ লিপিতে রচিত মরমী ও অন্যান্য সাহিত্য পুনরুদ্ধারের মহতী উদ্যোগ প্রশংসার দাবী রাখে। কথ্য ভাষাকে লিখিত রূপ দিয়ে ভাষাটিকে অমরতা দেয়ার যে তাগিদ থেকে সিলেটি নাগরী লিপির উদ্ভব, আজ সেই একই তাগিদ থেকেই এ লিপির পুনরুত্থান হোক, সে আশা করা যেতেই পারে।

লেখক পরিচিতি

বিপাশা বিনতে হক
বিপাশা বিনতে হকের জন্ম ঢাকায়, ২২ শে জুলাই, ১৯৭৫-এ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর পর তিনি ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এডুকেশনে পি এইচ ডি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলস-এ। তার গবেষণার বিষয় ছিল ইংরেজি শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন উচ্চারণের প্রভাব কীভাবে কাজ করে, তা খতিয়ে দেখা। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইংল্যান্ড-এ শিক্ষকতা করছেন। বিপাশা কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। কবিতা লেখেন বাংলা, ইংরেজি ও সিলেটি, তিনটি ভাষায়। ভাবের নূন্যক্তি তার কবিতার প্রাণ।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত