পর্ন ইন্ডাস্ট্রির নারী ও পুরুষাধিপত্যের যৌন বিকৃতি

সূচনাটিকা: এটি মৌলিক কোনও রচনা নয়। ইংল্যান্ডের সুন্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স ব্লগে প্রকাশিত লরেন স্মিথ নামের একজন সমাজতাত্ত্বিকের  “How does the Pornographic Industry Oppress Women? How would Prohibiting or Censoring Pornography Impact Society?” শিরোনামের এক গবেষণা প্রবন্ধকে উপজীব্য করে এই লেখার শরীর গড়ে উঠেছে। সেই মূল লেখার লিঙ্ক এখানে। সিজেএমবি এমন এক সময় এই লেখা প্রকাশ করছে যখন রাজধানীর কলাবাগানে স্কুলছাত্রী আনুশকাহ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের চোখের সামনে নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক অবদমন ও যৌনবিকৃতির এক নৃশংস বাস্তবতা আকারে হাজির হয়েছে। এই লেখাটি আনুশকাহ’র স্মৃতির উদ্দেশে। [সিজেএমবি]

পর্ন ইন্ড্রাস্ট্রির সঙ্গে কেউ কেউ নারী স্বাধীনতার সংযোগ খুঁজতে চাইলেও বাস্তবতা আদতে ভিন্ন। আসলে এটি নারীর সঙ্গে নিপীড়নমূলক সম্পর্কে আবদ্ধ। কী করে এই নিপীড়ন জারি থাকে? পর্নগ্রাফির ওপর যদি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তাহলে সমাজে তার প্রভাব কী হতে পারে? এই প্রবন্ধে সেই আলাপ তোলা হয়েছে।

পর্নগ্রাফিকে বলা যেতে পারে, লিখিত বা দৃশ্যগত এমন বস্তু, যা যৌন কর্ম, যৌন উত্তেজনা কিংবা যৌনাঙ্গকে সুস্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে চিত্রিত করে। বৈশিষ্ট্যগতভাবে যৌন প্রকৃতিই সেখানকার প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচ্য হয়। অন্যদিকে ইরোটিকাকে বলা যায় সাহিত্য, চলচ্চিত্র, কিংবা শিল্পকলার এমন এক মাধ্যম, যা যৌনতার উপস্থাপনের মাধ্যমে তার দর্শক কিংবা ভোক্তাকে ধীরে ধীরে যৌন উত্তেজিত করতে চায়।  ইরোটিকা আর পর্নগ্রাফিকে তাই আলাদা করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৭২০০ খৃস্ট পূর্বাব্দে যখন প্রথম ইরোটিকার আবির্ভাব ঘটে, তখন একে কেন্দ্র করে তেমন কোন সামাজিক কলঙ্ক ছিল না। এটাকে কম নিপীড়নমূলক মনে করা হতো।

পর্ন ভোক্তাদের বড় অংশই জানে না, তারা নিজেরা পরোক্ষভাবে নিপীড়নে কতোটা ভূমিকা রাখছে।  কিছু কিছু ছবিতে মানুষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের এমন ধারার যৌনকরণ (সেক্সুয়ালাইজ) হয়, যেন তারা বিক্রয়যোগ্য কোনও শরীর। বিজ্ঞাপন আর জনপ্রিয় সংস্কৃতির (পপ কালচার) মতো করেই পর্নগ্রাফির কেন্দ্রীয় বিবেচ্যও এই ‘বিক্রয়যোগ্য শরীর’ নির্মাণ।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভোগ্যবস্তু হিসেবে নারীদের যৌনকরণ  হয়, এবং এই ছবিগুলো আপনি বিজ্ঞাপনে ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে  দেখতে পাবেন, এবং এটাই পর্নোগ্রাফির মূল বিষয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মানে হলো, পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে সফল হতে গেলে নারীকে তার ব্যক্তিগত কর্তাসত্তা থেকে নেমে বস্তুতে রূপান্তরিত হতে হবে।

পর্ন ইন্ডাস্ট্রির স্বর্ণযুগ হিসেবে দেখা হয় ১৯৭০ এর দশককে। অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে তখন ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ পর্ন বানিয়েছে আর সবচেয়ে বেশি মানুষ তা দেখেছে। সত্তর আর আশির দশকের মধ্যবর্তী সময় জুড়ে তাই নারীবাদী অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক ছিল যৌনতা ও যৌনক্রিয়া নিয়ে৷  সেসময় পর্ন ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো যৌন স্বাধীনতা ও প্রেমহীন যৌনতাকে গৌরবান্বিত করতে শুরু করে। এ নিয়ে বহু বিতর্কের সৃষ্টি হয়, বিশেষত অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজে লাগানোর ব্যাপারে।  পর্ন কিংবা যৌনকর্মী এবং তাদের ভোক্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কোনও ইন্ড্রাস্ট্রিতে যৌন ঘনিষ্ঠতার সঙ্গেই জারি থাকে লৈঙ্গিক অসমতা। সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই যৌনঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আর বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যকার সীমারেখাটি অস্পষ্ট করা হয়। আর এখান থেকেই সূচনা হয় এক নৈতিক প্রশ্নের: নারীরা কি আসলেই স্বাধীন হতে পেরেছে?

পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদেরকে বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাদের হেয় করা হয় এবং নারীসত্ত্বাকে চূড়ান্ত রকমের অপমান করা হয়। বিপরীতে একই দৃশ্যে পুরুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করা হয়। দেখানোর চেষ্টা করা হয়, পুরুষের অংশগ্রহণই যেন যৌনতার কেন্দ্রীয় বিবেচ্য। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির বাজার যেন কেবল হেটারোসেক্সুয়াল পুরুষের জন্যই তৈরি হয়। আর পর্নগুলো তৈরিও হয় পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই, পুরুষের যৌনসুখের কথা মাথায় রেখেই।

যাইহোক, একটু খেয়াল করলেই  পর্ন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বর্ণবাদকে চিনে নেওয়া যায়। আশির দশকের পর থেকে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ঐতহাসিকভাবেই কোন পর্ন নির্মাণে কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে দেখা যায়নি।  এটার কারণ হচ্ছে, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি এক ট্যাবুর কারখানা যা নিষিদ্ধ প্রেমের ধারণার মধ্য দিয়ে জারি রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই শেতাঙ্গ পুরুষদের জন্য কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা কখনোই নিষিদ্ধ কোন কিছু ছিল না।

তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, ব্যাপারটা অনেকটা দাসত্বের ধারণার মতো। কালো নারীরা যেহেতু একদা শেতাঙ্গ পুরুষের দাসী ছিল, সুতরাং তাদের শরীরের উপর (শ্বেতাঙ্গ) পুরুষদের যেন এক অবধারিত ‘অধিকার’ ছিল।  তাই ‘নিষিদ্ধ প্রেম ধারণা’র পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের দেখা যেত না।  কিছু কিছু মেইনস্ট্রিম পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো সেই পুরনো বর্ণবাদী ধারণা মাথায় রেখেই পর্ন তৈরি করছে, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ মানেই পাশবিক আর কৃষ্ণাঙ্গ নারী মাত্রই  যৌনতার জন্য সহজলভ্য পাশবিক নারী।

লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্লেষণ করতে চাইলে নারীবাদ একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবস্থান হিশেবে হাজির হয়। ‘দ্য ফেমিনিস্ট সেক্স ওয়ারস’ (যা একসময়  পর্ন ওয়ার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল) নামে  কিছু সম্মিলিত বিতর্ক সত্তর ও আশির দশকে  যৌনতা ও যৌনক্রিয়া নিয়ে নারীবাদীদের মাঝে বেশ উত্তেজনাপূর্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।  এদের একটি ধারা ছিলো পর্নবিরোধী নারীবাদীদের।  তাদের যুক্তির জায়গাটা ছিল, পর্নোগ্রাফি নারীদের প্রতি একধরণের হিংস্রতা এবং পর্নোগ্রাফির শ্যুটিংয়ের সময়ে নারীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন করা হয়। পর্নোগ্রাফি অবধারিতভাবেই নারীদের শারীরিক, মানসিক এবং/অথবা অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।  আরেকদল যৌনতাবাদী (সেক্স পজিটিভ) দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন৷ এই দুই ধারার মধ্যে এরোটিকা ও পর্নোগ্রাফিতে যৌনতার প্রকাশভঙ্গী নিয়ে মতানৈক্য ছিল।

পর্নবিরোধী নারীবাদীরা পর্নকে নারীদের উপরে একধরণের আক্রমণ হিসেবে দেখেন৷ তাদের যুক্তি, নারীরা পর্নের মাধ্যমে শোষিত ও নিগৃহীত হয়। সে কারণে পর্নোগ্রাফিকে একটা বিধি-নিষেধের আওতায় আনা গেলে সমাজ উপকৃত হবে। কেননা পর্নোগ্রাফির মাধ্যমেই সমাজের পুরুষেরা প্রধানত নারীদের নিপীড়ন করতে শেখে৷  পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে নারীরা তাদের মানবিক স্বরূপ হারিয়ে ফেলে এবং  এটা উৎপত্তিগতভাবেই নারীদের প্রতি সহিংস। সমাজে পর্নোগ্রাফি শুধু নারীদের ক্ষতি ডেকে আনছে তা নয়, বরং ভোক্তা পুরুষেরও নানাবিধ ক্ষতির কারণ এই পর্নোগ্রাফি৷ তাই, নারীদের একাংশ পর্নোগ্রাফিকে একটা বিধি-নিষেধের আওতায় নিয়ে আসার দিকে জোর দেন। তারা মনে করেন, এতে সমাজ উপকৃতই হবে। জনগণের মানসপটে লুকিয়ে থাকা নারীবিদ্বেষী মনোভাব পরিবর্তন করা সম্ভব হবে৷

যারা পর্ন দেখে, তারা তো ধারাবাহিকভাবে নারীদের নিগৃহীত হতে দেখে। এতে তাদের মাঝে একটা নিম্নমানের যৌনতাসর্বস্ব রুচি গড়ে ওঠে। নারীবিদ্বেষী মনোভাব এখনো আমাদের সমাজে বিরাজ করছে এবং নারীদের প্রতি নেমে আসা বিভিন্ন যৌন সহিংসতার ঘটনায় প্রায়ই নারীদের ভিক্টিম ব্লেমিং করা হয়। দশকের পর দশকজুড়ে হাস্যরসের উপাদান হিসেবেও নারীবিদ্বেষ  বিরাজমান এবং এটা একটা সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাপার হয়ে গেছে যে, যৌনবৈষম্যমূলক কৌতুক (সেক্সিস্ট জোক) দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে পরিবেশন করা হবে, কিন্ত সেটা নিয়ে কোন লুকোছাপা বা অপরাধবোধ থাকবে না৷ এই ব্যঙ্গ-কৌতুকগুলো ধ্বংসাত্মক তো বটেই, পাশাপাশি এগুলো আমাদের  দেখিয়ে দেয় যে, সমাজে বসবাস করা জনগণের একটা অংশই এই মতবাদকে পুষ্ট করতে চায় যে সমাজের একটা অংশ অন্য অংশের চেয়ে নিম্নস্তরের৷ আর এটা কেবল সেই রাষ্ট্র বা সমাজেই সম্ভব হতে পারে, যেখানে জনগণ বেশ ভালোভাবেই শোষিত ও নিপীড়িত রাষ্ট্রের দ্বারা। একজন সাধারণ মানুষ এসব ব্যঙ্গ-কৌতুক শুনে হাসবে।তারা উপলব্ধি করবে না যে, তাদের এই হাসিটাই সমাজের অন্যান্য উগ্র মানুষের জন্য নারীদের প্রতি যৌনবাদী হওয়ার পথ সুগম করে দিচ্ছে ৷ তাদের যেটা জানা দরকার, আমাদের সমাজে এখনো নারীবিদ্বেষের চোরাস্রোত বয়ে যাচ্ছে এসব ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে, আর নারীবিদ্বেষ এখনো সামাজিক পরিসর থেকে নির্মূল হচ্ছে না এরকম গুরুতর একটা বিষয়কে হালকা করে দেখার কারণেই।

‘নারীকে দোষারোপের ব্যাখ্যা ‘ শিরোনামে একটা নারীবাদী তত্ত্ব আছে । এই তত্ত্বের কেন্দ্রীয় বিবেচ্য  কীভাবে সমাজ নারীকে অসহায় হতে শেখায় এবং তাদের কাছ থেকে সমাজ-নির্ধারিত নারীসুলভ বাইনারি লৈঙ্গিক আচরণ প্রত্যাশা করে।  এই পরিস্থিতিতে যেসব নারী এসব কথিত নারীসুলভ আচরণ অনুসরণ করতে চায় না, করেন না, তাদের পথভ্রষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলশ্রুতিতে এই নারীদের সাথে যখন যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটে, তখন এই নারীদের উপরেই সমস্ত দোষ চাপানো হয় ‘পথভ্রষ্ট’ হওয়ার দোহাই পেড়ে৷ পর্নোগ্রাফিতে এর একটা প্রতিচ্ছবি দেখা যায়৷ এখানে তাদেরকে দেখানো হয় একজন অনুগত, বাধ্য নারী হিসেবে। এই ব্যাপারগুলো আমাদের জনপরিসরের খুবই পরিচিত দৃশ্য। আবার এই একই বিষয় আপনি খুঁজে পাবেন নারী নিপীড়কদের ভাষ্যে, যখন তারা এই নিপীড়ন করার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় তাদের ইন্ধন জুগিয়েছে, তার বর্ণনা দেয় এবং এর মাধ্যমে নারী নিপীড়নে তার দায় এড়াতে চায়।

একজন ব্যক্তি যখন ভিক্টিম ব্লেমিং করতে চায়, তখন আসলে সে ব্যক্তিগতভাবে এসব অপ্রীতিকর ব্যাপার থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চায় এবং ভিক্টিম ব্লেমিং করার মাধ্যমে সে নিজের দুর্বলতা থেকে রক্ষা পেতে চায়। সে কারণেই অবধারিতভাবে আমরা বলতে পারি, এখনও যে নারীবিদ্বেষী আচরণ আমাদের সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে, তা এই পর্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকেই একধরণের প্রণোদনা পেয়ে থাকে, কারণ নারীর প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গির যে স্ট্যান্ডার্ড সেটা ক্রমশ নীচের দিকে নামতে থাকে ক্রমাগত পর্নে নারীদের উপর আধিপত্য বিস্তারের দৃশ্য উপভোগের মধ্য দিয়ে।

কেন এত বেশি মানুষ আরেকজনের উপরে নিপীড়নের দৃশ্য দেখে যৌন তৃপ্তি খুঁজে পায়, ‘পুরুষবাদী দৃষ্টিভঙ্গী তত্ত্ব’  নামের আরেক নারীবাদী ধারণায় মূলত তা উদঘাটন করার চেষ্টা করা হয়েছে৷  পর্নগ্রাফিতে পুরুষকে যৌনতায় সক্রিয় আর নারীকে যৌন-নিষ্ক্রিয় এজেন্সি হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে নারীদের উপর পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে সিনেমাটিক অভিজ্ঞতায় নিয়ে আসা যায়।

পর্নোগ্রাফিক সিনেমাগুলো আসলে তৈরিই করা হয় এমনভাবে, যেন সমস্ত অংশটা পুরুষের উপভোগ করার মতো হয়। পর্ন দেখে নারীদের পরিতৃপ্তির কোন সুযোগই থাকে না। এইসব পর্নে নারীদের বস্তুতুল্য করে পরিবেশন ক্রমাগত বৃদ্ধিই পায়। পর্নের শ্যুটিংয়ে ক্যামেরাগুলো এমনভাবে সেট করা হয় যেন, এটা পুরুষদের জন্যই তৈরি হচ্ছে, কেবলমাত্র পুরুষেরাই এর ভোক্তা। এটা আপনি আরো ভালো বুঝবেন, যখন পর্নে দেখবেন, কেবলমাত্র নারীদের দেহকেই অতিরিক্ত যৌনায়িত করা হচ্ছে ৷ ফলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এসব পর্নোগ্রাফিক সিনেমা কেবলমাত্র পুরুষের উপভোগের জন্যই তৈরি হয় এবং এর মাধ্যমে নারীকে বস্তুতুল্য হিসেবে দেখার প্রবণতাকে আরো উৎসাহিত করা হয়।

নারীবাদের আরেকটা প্রধানতম তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্নোগ্রাফিকে পুরুষত্ব  প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পর্নে পুরুষত্বের অস্বাভাবিক উপস্থাপন নারীদের আপত্তিকর রূপে হাজির করার পাশাপাশি নিপীড়নের পরিবেশ গড়ে তোলে। এই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাদরে লালন করা হয়। এই ধারার প্রতিষ্ঠানে তাই একধরণের অসমতা বিরাজ করে নারী-পুরুষের মাঝে৷ সমাজে এখনও নারীদের অবমূল্যায়ন হয়, বিশেষ করে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে এর পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। কারণ এখানে নারীর শরীরই হলো পুঁজি। বেশিরভাগ পর্নোগ্রাফিক সিনেমাগুলোতেই দেখানো হয়, উপস্থাপিত যৌনতার নিয়ন্ত্রণ পুরুষের হাতে। এতে নারীদের উপর পুরুষদের একধরণের দখলদারিত্বের বাস্তবতা উপস্থাপন করা হয়। পর্নগ্রাফির এই প্রবণতাগুলো যৌনতায় পুরুষতান্ত্রিক ভাবনাগুলোকে শক্তি যোগায় । নারীদের নিপীড়ন করতে এবং যৌনতায় শক্তিশালী সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী হিসেবে কেবল পুরুষকে তুলে ধরতে পরোক্ষে ভূমিকা পালন করে৷

অনেকে বলেন, হেটারোসেক্সুয়াল পর্নে নারীর উপর পুরুষের আধিপত্যের সঠিক পরিবেশনাও হয় না। এখানে বরং দেখানো হয়, কীভাবে পুরুষ তার পৌরুষকে একটা প্রাকৃতিক সত্তার উপরে প্রয়োগ করে। কীভাবে পুরুষ প্রকৃতিকে শাসন এবং এর উপরে আধিপত্য বিস্তারের পুরুষতান্ত্রিক আদিম বাসনার উৎকট প্রকাশ ঘটায়৷ ‘আধিপত্যবাদী পৌরুষ’ তত্ত্ব পর্নকে বিবেচনা করে পুরুষের মাধ্যমে নারীকে মৌখিক ও শারীরিক ক্ষতি এবং বলপূর্বক নির্যাতিত হতে দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে। এছাড়া নারীর অসম্মতিতে আক্রমণাত্মক আচরণ তো আছেই। পুরুষের এরকম আচরণ দেখানোর অন্যতম ফলাফল হচ্ছে একধরণের ভীতি তৈরি হওয়া। ভয়টা হচ্ছে, পুরুষ যদি যৌনতায় এই আক্রমণাত্মক আচরণ না দেখায়, তাহলে তাদের পৌরুষ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর কোনভাবে একবার কারো পৌরুষ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার সমাজচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে সে তার এই ভয় থেকেও নারীর প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে বাধ্য হয়, কেননা পর্নে পাওয়া শিক্ষা অনুযায়ী পুরুষ করবে নারীর উপর আধিপত্য, নারী পুরুষের অধীন। আর এইরকম পরিবেশেই হোমোফোবিয়া এবং নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের মতো সংস্কৃতির উর্বর জমিন তৈরি হয়। পুরুষেরা নারীদের কেবলই নিজেদের যৌন-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার মতো বস্তু হিসেবে দেখবে, বিপরীতে নারীরাও নিজেদেরকে কেবলই পুরুষের যৌন-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার মাধ্যম বিবেচনা করবে; পর্ন ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো এই ধারণাকেই জোরদার করে। এটা প্রমাণিত যে, পর্ন ধারণের সময় নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য প্রদর্শন ও নারীকে ঘিরে নানান ধারার বাজে কথা বলার মধ্য দিয়ে পর্ন ইন্ড্রাস্ট্রিতে শক্তিশালী পৌরুষের নিশানা হাজির করা হয়। এই সংস্কৃতিই সমাজে জারি থাকা নারী-নির্যাতন ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে৷ এই পরিবেশ নারীকে পুরুষের অধীনস্থ দেখানোর মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান অসমতাকে নিরঙ্কুশ করে। বিরাজমান আধিপত্যবাদী পুরুষতন্ত্রকে যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত রাখে।

পর্নগ্রাফিতে যৌনতার পরিবেশনা নারীর নিপীড়নমূলক বাস্তবতার দলিল; সেখানে তাদেরকে যৌনবস্তু ও সবসময়ের জন্য পুরুষের ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখানো হয়। পর্নগ্রাফির ওপর সেন্সরশিপের পক্ষের আলাপটা সে কারণে কেবল নারীপ্রশ্ন নয়। যৌনক্রিয়ার যে কোনও ধরনের দেখনদারিই যে আসলে ক্ষতিকার, সেটাই এই আলাপের কেন্দ্রীয় বিবেচ্য। একজন নারী তাত্ত্বিক তাই বলেন,  যখন পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব থাকবে না, তখনই কেবল নারীরা  টের পাবে যে তারা স্বাধীন। যতোদিন পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব থাকছে, নারীদেরকে বুঝতে হবে যে তারা একই সেই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে এবং তাদের অবমূল্যায়নই এসবের [পর্নগ্রাফি] উদ্দেশ্য।

কোন কোন তাত্ত্বিক অবশ্য পর্নোগ্রাফির উপরে সেন্সরশিপের বিরোধিতা করেছেন। তাদের ধারণা ছিল, সমাজে যে বিভিন্ন সহিংসতা বিরাজ করে, তার সাথে পর্নোগ্রাফির কোন যোগসূত্র নেই। লিবারেল নারীবাদীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, পর্নোগ্রাফির উপরে বিধিনিষেধ জারি করা আরেক ধরণের পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তাদের মতে নারীবাদী আন্দোলন ছিল যৌনতার স্বাধীনতার জন্য, কিন্ত এর উপর বিধিনিষেধ জারি করা পুরুষের হাতেই সেই আন্দোলনের ফসল তুলে দেওয়ার সামিল হতে পারে৷ তবে বাস্তবতা আদতেও তেমন নয়।

পুরুষতান্ত্রিকতার হাতিয়ার হয়ে পর্নগ্রাফি যেহেতু প্রকাশ্যেই নারীর ওপর নিপীড়ন চালায়, সে কারণে নারীর স্বাধীনতা কেবলমাত্র পর্নোগ্রাফির অনুপস্থিতিতেই সম্ভব।  পর্নোগ্রাফির উপরে বাধানিষেধ বা একে নিষিদ্ধকরণের প্রশ্ন তাই একটা লিঙ্গ-আধিপত্যশীল ইন্ডাস্ট্রির পতনের প্রশ্ন। পর্নোগ্রাফিতে হিংস্রতা ক্রমাগত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলেই সমাজে গুরুতর জঘন্য যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে পারছে। যারা এসব ক্ষতিকর পর্নগুলো দেখছে, তাদের ভিতরে নারীর উপর আধিপত্য বিস্তারকে স্বাভাবিত প্রবণতা আকারে ধরা দিচ্ছে৷ অন্যদিকে যেসব দেশে পর্নোগ্রাফির উপরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেসব দেশে ধর্ষণ ও নিপীড়নের হার কমার প্রবণতাও লক্ষণীয়।

সত্যিকার অর্থে, যখন পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব থাকবে না, তখনই কেবল আমরা জানবো যে, নারীরা স্বাধীন হতে পেরেছে। যতোদিন পর্নোগ্রাফির অস্তিত্ব থাকছে, আমাদের বুঝতে হবে যে,  নারীরা অবদমনযোগ্যই থাকছে, এবং তাদের অবমূল্যায়নই এসবের উদ্দেশ্য।

শেষ পর্যন্ত আমরা পুরো লেখার উপসংহার টানতে পারি এটা বলে যে, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি সমাজে নারীর উপর নিপীড়নের সমস্ত মাধ্যমকে শক্তিশালী করার এক ভয়াবহ কাজটি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। ফলে এর উপর নিয়ন্ত্রণ বেশ ভালো একটা পরিবর্তন আনতে পারে সমাজে। বিশেষত নারীর উপরে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের যে ভয়াল খায়েশ আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত দেখছি, তা অনেকাংশে কমানোর ক্ষেত্রে পর্ন ইন্ডাস্ট্রির উপর নিয়ন্ত্রণ ও একে নির্মূল করার দিকে এগিয়ে যাওয়া একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক পরিচিতি

মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুম
মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুমের জন্ম বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। ছোটবেলায় কওমি মাদ্রাসায় হাফেজ হয়েছিলেন। এরপর শিবগঞ্জ পাইলট হাইস্কুল থেকে এসএসসি ২০১৭ সালে আর বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি ২০১৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ক চিন্তা ও চর্চার পাশাপাশি অবসর সময়ে বই গান, সিনেমা এসব নিয়েই থাকেন।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত