পেটার হান্ডকে দ্বিধা | মার্টিন কেম্পশেন

২০০৪ সালে সাহিত্য-বিশ্ব পুরোপুরি অবাক হয়েছিলো যখন অস্ট্রিয়ার খ্যাতমান লেখক পেটার হান্ডকের পরিবর্তে অস্ট্রিয়ার আরেক নাট্যকার এলফ্রিডে য়েলিনেককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে এই পুরস্কারের জন্য পেটার হান্ডকেকে মনোনীত করে নোবেল কমিটি বিশ্বকে আবারও অবাক করিয়ে দেয়—তাকে মনোনীত করার কারণে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিলো। প্রথমত কমিটি আশ্বাস দিয়েছিলো যে, তারা পরিধি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইউরোপের বাইরে অন্য মহাদেশের লোকদের নোবেলের জন্য মনোনীত করবে, কিন্তু দেখা গেলো তারা ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের নোবেল পুরস্কারের জন্য একজন ইউরোপিয়ানকেই মনোনীত করেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের নোবেল মনোনয়ন নিয়েও আলোচনা করে। দ্বিতীয়ত, পেটার হান্ডকের পরিচিতিতে সামান্য দাগ ছিলো। তিনি তার মায়ের দিক থেকে সাইবেরিয়ান ছিলেন এবং তিতোর মৃত্যু আর যুগোস্লোভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিনি সার্বদের পক্ষ নিয়েছিলেন। যুগোস্লোভিয়ার শান্তিপ্রিয় মানুষজন এক সময়ে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। স্লোবদান মিলোশেভিচের নেতৃত্বে থেকে সার্বিয়ান মিলিটারিরা অসংখ্য নিরীহ বেসামরিক লোকদের নির্বিচারে হত্যা করলো। পেটার হান্ডকে সেই সার্বিয়ান মিলিটারি এবং তাদের নেতার পক্ষ নিয়ে লিখলেন। কেবল একবার নয়, বহুবার তিনি তাদের সমর্থনে লিখলেন। তিনি নোবেল পুরস্কার মনোনোয়ন গ্রহণ করে সাংবাদিকদের পুনরায় একই কথা বললেন—‘আমি কিছুই ফিরিয়ে নিই না’।

হান্ডকের বয়স এখন ৭৬ বছর। আমরা একই প্রজন্মের মানুষ। গ্যুন্টার গ্রাস এবং অন্যান্যদের সঙ্গে আমরাও একই সময়ে বড় হয়েছিলাম। বিগত বছরগুলোতে হান্ডকে আমার গুরু, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণার মানুষ ছিলেন। যেখানে গ্যুন্টার গ্রাসের লেখা এবং কাজকর্ম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, সেখানে হান্ডকের-ও একই উদ্দেশ্য ছিলো তবে তা আরও গভীর। এই দুই জন লেখক ভিন্ন মতাদর্শের, যে তারা একে অপরের পরিপূরক। তারা জার্মান গণহত্যার ভয়াবহতাকে নিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন। গ্যুন্টার গ্রাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ডানসিগ-এ তার শৈশব এবং কৈশোরে অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালিখি শুরু করেন। তিনি তার উপন্যাস ‘দ্য টিন ড্রাম’ (দি ব্রেখত্রোমেল) এবং অসংখ্য প্রবন্ধ, বক্তৃতা এবং আলাপচারিতায় জার্মানদের মনে কন্সেন্ট্রেশান ক্যাম্প এবং নাৎসি ভয়াবহতার অপরাধবোধ মনে করিয়ে দেন।

পেটার হান্টকে জার্মান ভাষাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের মাধ্যমে তার কাজ শুরু করেন। পুরাতন ভাষাটি নাৎসি অপভাষায় কলঙ্কিত ছিলো, যার  ভেতর নাৎসিদের ভয় এবং হিংস্রতা লুকিয়ে ছিলো। হান্টকে ভাষা নিয়ে পরীক্ষণ করতেন আর আমরা যেভাবে বাস্তবকে দেখি তা নিয়েও তিনি পরীক্ষা করেছেন। তিনি প্রকৃত শ্রেণি-পদবিন্যাস উল্টে দিলেন এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক আর সাধারণ অবস্থায় তার চরিত্রগুলোকে কঠিন লড়াই করে চলতে হয়েছে। এ যেন বাস্তবকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হয়েছে।

পেটার হান্টকে অস্ট্রিয়ার লোক, কিন্তু আমরা জার্মানরা তাকে নিজেদের লোক মনে করি। কারণ আমাদের মধ্যে ভাষা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জীবন ও তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি একই রকম। আগে তার লেখাগুলো প্রকাশ হতো ফ্রাঙ্কফুর্টের জুরকাম্প প্রকাশনী থেকে। এখন তাদের অফিস বার্লিনে। আমার মনে আছে, জারব্র্যুকেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার একটি পাঠ অনুষ্ঠান হয়েছিলো, তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র। অডিটোরিয়াম দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ ছিলো, তিনি আসলেন, দেখে মনে হলো তিনি যেন একজন শিশু। সময়টি ছিলো ১৯৬৭ বা ৬৮-এর শীতের দিকে, তখন হান্টকে তার খ্যাতির শীর্ষ ছুঁইছুঁই পর্যায়ে ছিলেন। তার বয়স এবং পরীক্ষিত ভাষা, জার্মানির অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গর্জনের সঙ্গে ভালোই মিলেছিলো। হান্ডকে যখন পড়া শুরু করলেন তিনি যেন হঠাৎই তার পাঠের চরিত্রে বদলে গেলেন। তিনি স্ট্যাক্যাটো (staccato) ছন্দে শ্রোতাদের তার কাব্যিক লাইন শুনিয়ে মুগ্ধ করলেন। তিনি উদ্দীপনা এবং নিশ্চয়তা নিয়ে পড়লেন, দেখে মনে হবে না যেন তার মধ্যে শিশুসুলভ বলতে কিছু একটা ছিলো! 

তারপর আমি তার প্রথম দিকের নাটক ‘জনগণের অপব্যবহার’ (Publikumsbeschimpfung) দেখলাম। আবারও ভূমিকার সেই বিপরীতমুখী পরিবর্তন। দর্শকরা কেবল অভিনেতাদের সমালোচনা করতেই সাহস পায়নি, অভিনেতারাও দর্শকদেরকে চিৎকার এবং খিস্তি ছাড়লো। খালি মঞ্চেই এক দল অভিনেতা আমাদেরকে খারাপ কথা শুনালো। আর পারফরমেন্সের মধ্যে সেই একই ছন্দ এবং নিশ্চিন্তে খেলার একটি শক্ত অনুভূতি ছিল।

পেটার হান্ডকের মধ্যে একটা পরিবর্তন খুব দ্রুত দেখা গেলো। শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি মানব জীবনের গভীরে চলে গেলেন। তিনি সেক্যুলার হয়ে গেলেন। যদিও তাঁর মা ক্যাথলিক ছিলেন, কিন্তু প্রথাগত দৃষ্টিতে তাঁকে তেমন ধার্মিক দেখায়নি। তিনি খ্রিস্টান নৈতিকতা, সংস্কৃতি মানতেন না। এর পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি নিজের মতো করে আধ্যাত্মিক দুনিয়া খুঁজেছেন এবং প্রকৃতিকে উদ্ঘাটন করেছেন। আধ্যাত্মিক প্রাচুর্য এবং রোমান্টিক অনুভূতি থেকে নিজেকে দূরে নিয়ে গেছেন। এর পরিবর্তে তিনি তাঁর ক্লিনিক্যালি প্রশান্ত এবং যথাযথ লেখাতে আত্মা খোঁজার প্রয়োজনবোধ করেছেন। আমার মতে, এই আধ্যাত্মিকতা বর্তমানে পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাচ্ছে, যাকে বলা যায়, প্রথাগত খ্রিস্টান ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে পেটার হান্টকে প্রচুর লিখেছেন, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ, ডায়েরী এমনকি সিনেমার স্ক্রিপ্ট—সাহিত্যের এমন কোনো জায়গা নেই যে তিনি হাত দেননি। তবুও তাঁর পাঠকের সংখ্যা ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে। প্যারিসের উপকণ্ঠে তিনি একটি হেরমেটিক্যালি জীবন-যাপন করেন। তাঁর পাঠক মনে করে যে তিনি এখন প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি সুস্থ নান্দনিক জীবন কাটাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে, হান্ডকের কাছে যে বর্শা আছে তা রূপান্তর হয়ে আলোক-বর্তিকা হতে পারতো। কিন্তু তিনি সার্বিয়ানদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করেছেন বলে তা আর হতে পারেনি। 

ভাষান্তর : আদিত্য শংকর

লেখক পরিচিতি

মার্টিন কেম্পশেন
একাধারে লেখক, অনুবাদক, সাংবাদিক এবং সমাজসেবী। জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৮, জার্মানির বোপার্ডে। তিনি জার্মান ভাষা ও সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করেছেন। ১৯৭৩ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন—এখনো পর্যন্ত সেখানেই বছরের অর্ধেকের বেশি সময় পার করেন। সরাসরি মূল বাংলা থেকে জার্মানে অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও শ্রী রামকৃষ্ণের রচনা। ইংরেজি থেকে জার্মানে অনুবাদ করেছেন স্বামী বিবেকানন্দের রচনা। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রচুর লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত