মাংস | ভার্জিলিও পিনেরা

[অনুবাদ : মাইশা তাবাসসুম]

[ভার্জিলিও পিনেরার জন্ম ১৯১২ সালের ৪ আগস্ট কিউবার কারডেনাসে। তিনি একাধারে নাট্যকার, কবি, ছোট গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক ছিলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে সমকামিতার জন্য তিনি তার সাহিত্য জীবনে বিখ্যাত তো হতে পারেনইনি, বরং কুখ্যাত হয়েছেন। সমকামিতার দায়ে ১৯৬১ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়, এক‌ই কারণে চে গেভারার রোষানলে পড়েন তিনি। কারাগার থেকে ফেরার পর কোনো লেখা প্রকাশ হবে না জানা সত্ত্বেও বাকি জীবন লেখালেখি করেই কাটিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাভানায় মৃত্যু বরণ করেন তিনি। পরবর্তীতে তার লিখে যাওয়া ৪৩ টি গল্প নিয়ে ‘কোল্ড টেলস্’ নামে একটি গল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়।]

ব্যাপারটা ঘটলো খুবই সাদামাটাভাবে। কোনো এক কারণে শহরটায় হঠাৎ মাংসের ঘাটতি দেখা দিলো। সবাই শঙ্কিত, সতর্ক, বিরক্ত, আরও যা যা হ‌ওয়া সম্ভব, হয়ে উঠলো। একদল চাইলো প্রতিবাদ করতে, যদিও অভাব আর হুমকির মুখে কোনো প্রতিবাদ‌ই খাটেনি। বরং খুব কম সময়েই শহরবাসী বিচিত্র সব শাক-সবজি খেতে আরম্ভ করলো।

ব্যতিক্রম র‌ইলো একমাত্র আনসালদো। এই দুর্দিনের শুরু থেকেই তিনি তার রান্নাঘরের সবচেয়ে বড় ছুরিটি শান দিতে লাগলো—দিন পাঁচেক পর আস্তে করে প্যান্টটি খুলে নিজের বাঁ পাছা থেকে কেটে নিলো এক টুকরো নির্ভেজাল হাড্ডিহীন মাংস। তারপর সেটিকে লবণ ও ভিনেগার দিয়ে ধুয়ে, সেদ্ধ করে, বিশেষ এক পাত্রে চড়ানো হলো ভাজার জন্য। এক সময় প্রতি রবিবারে এই পাত্রেই বিশেষ বিশেষ তরিকায় রান্না হতো, হ্যাম, মাটন, সসেজ, চিকেন। আনসালদো যখন মাংসটি খাচ্ছে, ঠিক সেই সময় তার বাসায় এসে উপস্থিত হলো এক প্রতিবেশী। নিজের অভাবের কথা বলতে গিয়ে সে দেখলো টেবিলে চমৎকার এক টুকরো ভাজা মাংস। এই মাংসের উৎস জিজ্ঞেস করতেই আনসালদো খুব মার্জিতভাবে তার বাম পাছার কাটা অংশ দেখিয়ে দিলো। এরপর তাকে আসল ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হলো। সবকিছু শুনে প্রতিবেশী একটি শব্দ‌ও না করে চলে গেল, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়র সাহেবকে সঙ্গে করে হাজির হলো আনসালদোর বাড়িতে।

সবকিছু দেখে ও শুনে মেয়র আনসালদোকে অনুরোধ করলো যেন সে সবাইকে দেখিয়ে ও শিখিয়ে দেয়, কী করে নিজের দেহের মাংস খাওয়া যায়। যেই কথা সেই কাজ, সেদিন‌ই শহরের প্রধান ফলকে হাজির করা হলো আনসালদোকে, এবং জড়ো করা হলো শহরের সবাইকে। প্রথমে প্লাস্টার মডেলের মাংস দেখিয়ে সে ধারণা দিলো যে, প্রত্যেকে নিজের বাম পাছা থেকে এরকম আকারের হাড্ডি ছাড়া দুই টুকরো মাংস কেটে নিতে পারবে। তারপর সে তার বাম পাছা থেকে বাকি মাংসটুকু কেটে দেখালো সবাইকে, যেন কেউই জ্ঞানের অভাবে নিজের সামান্যতম মাংস থেকেও বঞ্চিত না হয়। এখন প্রত্যেকে নিজ নিজ পাছা থেকে দুই দুই করে চার টুকরো মাংস কাটতে শুরু করলো। সে ছিল এক দেখার মতো বিষয়! হিসেব করে বের করা হলো যে গড়ে একজন স্বাভাবিক আকৃতির মানুষ নিজ মাংস কতদিন পর্যন্ত উপভোগ করতে পারবে। চিকিৎসকদের ধারণা অনুযায়ী, একজন ১০০ পাউন্ডের মানুষ (নাড়িভুঁড়ি ও রেচনাঙ্গ ব্যতীত) নিত্য আধপাউন্ড রেটে নিজ মাংস মোট ১৪০ দিন পর্যন্ত উপভোগ করতে পারবে। হিসেবটা একটু বিভ্রান্তিকর হলেও সবাই এ নিয়েই খুশি যে, এখন অন্তত সবাই মাংস তো‌ খেতে পারবে। শীঘ্রই মহিলাদের মাঝে কানাকানি শুরু হলো এই ব্যাপারটির কিছু সুবিধা নিয়ে, যেমন, যেসব মেয়েরা ইতোমধ্যে নিজেদের স্তন খেয়ে ফেলেছে, তাদের আর আলগা কাপড়ে নিজের বুক ঢাকতে হচ্ছে না, পেটিকোটেই হয়ে যাচ্ছে। এদিকে একদল মুখরা রমনী যার যার জিহ্বা খেয়ে একদম বোবা হয়ে গেছে। এরকম অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাণ্ড দেখা যেতে লাগলো রাস্তাঘাটে। দুই বন্ধু অনেক বছর পর দেখা করলো, কিন্তু একে অপরকে চুমু খেতে পারলো না, কারণ সবে মাত্র তারা নিজেদের ঠোঁটের কাটলেট খেয়ে এসেছে। জেল প্রহরী কয়েদিদের ফাঁসির আদেশের কাগজে স‌ই করতে পারলো না, কারণ তার টসটসে আঙ্গুলের ডগা তার পেটে; এ ঘটনা থেকেই হয়তো ‘ফিংগার লিকিং গুড’ কথাটির প্রচলন।

ঘটনার বিপরীত দিকে কিছু কিছু ছোটখাটো আন্দোলন‌ও হয়েছিল। তার উল্লেখযোগ্য একটি হলো, গার্মেন্টসকর্মীদের আন্দোলন। এটা বেশ দীর্ঘ সময় চললেও, কোনোভাবেই আর মহিলাদের দ্বারা দর্জিদের চাকরি রক্ষা করা সম্ভব হলো না। শেষমেষ কোন আন্দোলন‌ই টেকেনি, আর শহরবাসী‌ও নিজের মাংস খাওয়া থেকে বিরত হননি।

সবচেয়ে রমরমা ঘটনা ছিল, শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যালে ড্যান্সারের শেষ মাংসের টুকরার ব্যবচ্ছেদ। নিজের শিল্পের প্রতি সম্মান রেখে সে তার পায়ের আঙ্গুলগুলো রেখে দিয়েছিল সবার শেষে ভক্ষণ করার জন্য। প্রতিবেশীদের মুখে জানা যায়, শেষের দিনগুলো তার খুবই অস্থির কাটে, এবং যখন মাত্র একটি পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা বাকি, তখন সে সকলকে তা দেখার জন্য ডেকে পাঠায়। এক অসহ্য নীরবতার পর আঙ্গুলটা কেটে ফেলে সে, আর একদম কাঁচা‌ই ঢুকিয়ে দেয় সেই গর্তে, যা ছিল একসময় তার মুখগহ্বর। সেই থেকে সেখানে উপস্থিত সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে ছিল।

কিন্তু জীবন চলতে থাকে, আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেরই ধারণা, সেই ব্যালে ড্যান্সারের জুতোই আজ স্মৃতি জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়। একমাত্র নিশ্চিত ঘটনা এই যে, শহরের সবচেয়ে মোটা মানুষটা (ভর ৪০০ পাউন্ডের‌ও বেশি) তার মাংসের বিপুল সঞ্চয় মাত্র ১৫ দিনে শেষ করে ফেলেছিল। এর অবশ্য কারণ আছে, প্রথমত তার মাংস খুবই পছন্দ, দ্বিতীয়ত তার বিপাক ক্রিয়া দ্রুত হয়। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় কেউ আর তাকে খুঁজে পেল না। যদিও সে আরো আগে থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, শুধু সে নয়, শহরের প্রায় প্রত্যেকেই এরকম পালিয়ে বেড়াতে লাগলো। সুতরাং একদিন সকালে মিসেস ওরফিলিয়া যখন তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, ড্রয়ারের চাবি কোথায়, সে কোনো উত্তর পেলো না। কারণ ছেলে তখন তার একমাত্র অবশিষ্ট কানটি খাওয়ায় ব্যস্ত। মায়ের অনেক আকুতিতে‌ও সে কিছু শুনলো না, তাই মুরুব্বিদের ডাকা হলো। কিন্তু মুরুব্বিরা আসতে আসতে চেয়ারে এক দলা পায়খানা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন সব ঘটনাবলী শহরবাসীর নিত্যদিনের জীবনে কোনো ব্যাঘাত ঘটায়নি। তাছাড়া জীবিকার দিক থেকে পরিপূর্ণ একটা শহর নিয়ে আক্ষেপের কী আছে? মাংসের ঘাটতির তো সমাধান হয়েই গেল। দিন দিন শহরের সব মানুষ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু এসব শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই, বিশেষ করে যখন এই চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের পেট একদম ভরপুর।

লেখক পরিচিতি

মাইশা তাবাসসুম
মাইশা তাবাসসুম। জন্ম ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৯। স্কুল ও কলেজ, ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যয়নরত।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত