শঙ্খ-কে, জন্মদিনে

কবির বয়স বাড়ে না। জগত তাঁর কাছে নতুন থাকে, তিনি সব সময় পৃথিবীকে নতুন করে দেখান। শিশুর চোখে এই দুনিয়া যেমন সদ্যজাত, কবির চোখ দিয়ে দেখলে পৃথিবীকে তেমনই নতুন লাগে। তাছাড়া কবির কাজ গোষ্ঠীর ভাষাকে অমলিন রাখা। ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ হয় শব্দ, বাকবন্ধ, উপমা, ক্লিশের কিষ্টতায় খচিত হয়ে ভাষা হয়ে যায় ম্রিয়মাণ আর পঙ্গু। সেই ভাষা কবির হাতে সজীব সপ্রাণ আর টাটকা হয়ে ওঠে। তাই কবির বয়স বাড়ে না। কিন্তু যে শরীরকে আশ্রয় করে কবিত্বের বিভা প্রকাশ পায়, সেই শরীরের তো বয়স বাড়ে। পেশী তেমন সটান থাকে না, ধমনী-শিরায় রক্ত চলাচল তেমন নির্বোধ থাকে না, চোখে চশমা ওঠে, কবির হটাৎ হটাৎ ঠান্ডা লেগে যায়।

শঙ্খ, ১৯৬৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তুমি আমাকে লিখেছিলে, ‘দুদিন আগে ৩৪ বছর পূর্ণ করে এলাম, চল্লিশের দিকে এগোচ্ছি ভাবতে হাত-পা হিম হয়ে আসে’।

যৌবন যখন চলে যেতে চায়, দূর থেকে বিদায়ের রুমাল ওড়ায়, তখন আমরা সব ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু সেই চলে যাওয়া এক সময়ে মেনে নিই আমরা; আত্মস্থ হই, চারদিকের সঙ্গে, বয়সের সঙ্গে একটা বোঝাপোড়া অজান্তেই ঘটে যায়। একটা কারণ হয়তো, চতুর্দিকে মৃত্যুর পদাঘাত বড়ো স্পষ্টভাবে শোনা যায়—‘সে যে আসে, আসে, আসে’। চলে যায় কতজন— খুকু ও বৌদি, শচীন-দিনেশের মতো বন্ধু, চারুর মতো পরিচারিকা—১৯৭৮ সালে দিনেশের মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি লিখেছিলে, ‘মৃত্যু বেশ ভালো রকমেই জাপটে ধরছে আমাদের’। মৃত্যুর নিত্যনৈমিত্তিক অস্তিত্বই বয়সকে মেনে নিতে আমাদের পরামর্শ দেয়। তাছাড়া যৌবনে যৌবনই একমাত্র সম্পদ, তাই যৌবনকে হারাতে ভয় পাই।

শঙ্খর কথা আজ তাঁর জন্মদিনে যখন ভাবি, তখন তো শুধু কবি শঙ্খ ঘোষের কথাই ভাবি না, ভাবি আমার সমান বয়সী ত্রিশ বছরের বন্ধুর কথা। একই এম.এ ক্লাশের ছাত্র ছিলাম আমরা, তবু ঘনিষ্ঠ পরিচয় প্রথমে ক্লাশের বাইরে। কিরণদা, কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের প্রজ্ঞানানন্দ পাঠাগারের বইয়ের তালিকা তৈরি করেছিলাম আমরা দু’জনে। যে-সময় ‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত তার ‘যমুনাবতী’ নিয়ে খুব সাড়া পড়ে গিয়েছে, সেই সময় আমার যাতায়াত শুরু হয়ে গিয়েছে তাদের শম্ভু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের তিনতলার একঘরের বাসায়। বৃদ্ধ ঠাকুমার নামাবলির মতো মূঢ় দেয়াল, সেই ঘরের দেয়াল ফাটছে, আশা ফাটছে। ‘যে দেয়ালেই চোখ পড়ে তার সে দেয়ালেই ক্ষয়’। এক কোণে তার পিতৃদেব মণীন্দ্রকুমার ঘোষ নিঃশব্দে কাজ করছেন, অন্য কোণে সত্যপ্রিয়দার উৎসাহে ব্রে খেলার আসর জমে উঠেছে, তৃতীয় কোণে বসে হয় আমরা উৎসাহে কলের গান বাজিয়ে গান শুনছি অথবা গল্প করছি। সেই-যে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলো, আজ ভাবি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দুজন মানুষের মধ্যে একজন শঙ্খ ঘোষ। তার বিয়েতে আমার ভূমিকাকে বহুগুণে বাড়িয়ে ঠাট্টার ছলে সে লিখেছিল, এই বিয়ের জন্য মূলত দায়ী আমি (অশ্রুকুমার শিকদার)—কারণ জীবনসঙ্গিনী প্রতিমার সঙ্গে শঙ্খর পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিলাম আমি। কতো স্মৃতি ভিড় করে আসে—শান্তি সম্মেলনে ‘ছেঁড়া তার’ দেখে মধ্যরাত পার করে পার্ক সার্কাস ময়দান থেকে পায়ে হেঁটে কলেজ স্ট্রীটে ফিরে আসা, গণেশ অ্যাভেনিউয়ের লাগোয়া ছোট্ট পার্কে রাস্তার আলোয় তার ‘সংবর্ত’ কবিতা পড়া, বৃষ্টির মধ্যে ময়দান দিয়ে র‍্যামপার্টের দিকে হেঁটে যাওয়া, যে অভিজ্ঞতার রূপান্তর ঘটে যায় বর্ষামেদুর ‘হোম করে নাও’ কবিতায়। অথবা নারকেলডাঙ্গা রেলওয়ে কলোনির বাড়ির চিলেকোঠায় তার একমাত্র ছোটগল্প শোনা। ইন্দ্র বিশ্বাস রোডের বাসায় দিন-দশেকের জন্য অগোছালো দিন যাপন করে দুই যুবা—পরীক্ষার খাতা দ্যাখে আর ‘সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত’-এর অনুবাদ সম্পাদনা নিয়ে নানা ভাবনা ভাবে। একজন প্রেষিতপত্নীক, অন্যজন তখনো অবিবাহিত। জলপাইগুড়ির বাড়িতে সারা দুপুর ধরে বিরতিহীন গুঞ্জন, শিলিগুড়িতে পথের ধারের দোকানে দাঁড়িয়ে রেডিওয় মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলার ধারাবিবরণী শোনা অথবা পথের ধারের বাড়ির বারান্দায় বৃষ্টির জন্য দাড়িয়ে থাকা। শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রভবনে একসঙ্গে কাজ, অস্থায়ী বাসার বারান্দায় পাশাপাশি চেয়ারে বসে অঝোর বর্ষার বিখ্যাত উদ্দামতা দেখা, অথবা জ্যোৎস্নারাতে সুকণ্ঠী গায়িকার গান শোনা। দেখা হলেই গল্প-পরচর্চা-হাসি আর কুশলবিনিময়ের মধ্যে চালাচালি হয়েছে সাহিত্যের কথা, কবিতার কথা—কে কী লিখেছে তাই শুধু নয়; কেন লেখা, কেমন করে লেখা, লেখার তাৎপর্য, তার মাধ্যম, তার গড়নধরন সবকিছুই। আমি নিজে যা লিখতে পেরেছি তা মূলত তারই জন্যে। আর দু’জনে দু’জনার রচনা সম্বন্ধে নির্লিপ্ত সমালোচনা করতে পেরেছি। কোনোদিন এক লহমায় এই ভাবনা মনে জাগেনি যে, বন্ধুত্ব আহত হতে পারে।…

শঙ্খর কবিতাবলি যখন পড়ি তখন বারে বারে ‘আদিম লতাগুল্মময়’ গ্রন্থের ‘অঞ্জলি’ কবিতাটির কথা মনে হয়। ‘ঘর যায় পথ যায় প্রিয় যায় পরিচিত যায়’, চতুর্দিকে ধাবমান জল, ‘প্লাবন করেছে সত্তা ঘরহীন প্রিয়হীন পরিচিতহীন’, সেই সমূহ সর্বনাশের পটভূমিতে জলবেষ্টিত টিলার উপর কবি যেন একা, দু’হাতে স্তব্ধ করে ধরা আছে করোটি, দেশকালের ভয়ঙ্কর সত্যগুলিকে পর্যবেক্ষণ করছেন, আর তার গূঢ় তাৎপর্যগুলিকে আত্তস্ত করতে চেষ্টা করছেন। ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’—এর ৬৩ সংখ্যক স্তবকে যেন তোমার নিজের কবিতারই কথা :

মাটি খুব শান্ত, শুধু খনির ভেতরে দাবদাহ/ হটাৎ বিস্ফারে তার ফেটে গেছে পাথরের চাড়।/ নিঃসাড় ধূলায় দাও উড়িয়ে সে লেখার অক্ষর/ যে লেখার জ্বর নেই, লাভা নেই, অভিশাপও নেই।/

তোমার সদগুণে ভরে উঠেছে এই রচনা। তাকে কি আগামীকাল বস্তুনিষ্ঠ বলে মেনে নেবে, নাকি এই রচনাকে বন্ধুর উচ্ছ্বাস অথবা প্রশান্তির প্রচলিত ধারা বলে বর্তমান বা ভবিষ্যতে বিদ্রূপই কুড়াবে?

আমার হয়ে উত্তর দেন শেক্সপীয়র, সুধীন্দ্রনাথের তর্জমায়—‘প্রেমে সত্যসন্ধ আমি, আলাপে ফুরাবে না মসী’ এবং ‘প্রবাদবিলাসী যারা অতিকথা তাদেরই মানায়/ আমি তো পসারী নই, গুণগানে আমার কী দায়?’

আরও মনে পড়ছে ইয়েটসের একটি কবিতার কথা। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ডাবলিনের পৌরচিত্রশালায় গিয়ে দেখেন সারি সারি বিলম্বিত রয়েছে তাঁর বন্ধুদের প্রতিকৃতি—হিউ লেন, অগাস্টা গ্রেগরি, জন সিঙ ইত্যাদির। দেখে তিনি ভাবলেন—‘my glory was I had such friends’। আমি শুধু অতীতকালকে বর্তমানকাল, বহুবচনকে একবচন করে নিতে চাই।

[সংক্ষেপিত, ঈষৎ সম্পাদিত, শঙ্খ ঘোষের পঞ্চাশতম জন্মদিনে প্রকাশিত]     
 

লেখক পরিচিতি

অশ্রুকুমার সিকদার
অশ্রুকুমার সিকদারের জন্ম ১৯৩২ সালের ৮ জানুয়ারি। পড়াশোনা শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি ও কলকাতায়। কর্মজীবন শুরু কলেজের শিক্ষক হিসেবে এরপর ১৯৭২ সাল থেকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে আছে ‘আধুনিক কবিতার দিগ্বলয়', ‘আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস, ‘নবীন যদুর বংশ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও রোথেনস্টাইন’ ইত্যাদি।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত