বিদায় আমার মানুষ-দেবতা শঙ্খ ঘোষ!

বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে গত ২১শে এপ্রিল না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলার কবি, বাঙালির কবি শঙ্খ ঘোষ। এই চলে যাওয়া শুধু তাঁর একার চলে যাওয়া নয়। তাঁর সাথে সাথে চলে গেল এক কিংবদন্তি, যিনি শুধু কবি নন, জ্ঞানী, বিদগ্ধ পণ্ডিত, আন্তরিক, হৃদয়বান, মিতবাক, নিরহঙ্কারী, সংযমী ও তুলনারহিত মানবীয় গুণসম্পন্ন একজন অসামান্য স্রষ্টাও। পঞ্চাশের দশকে যে কজন কবি বাংলা কবিতাকে বলতে গেলে দাপটের সঙ্গে শাসন করেছেন, তার প্রধানতম সারথি শঙ্খ ঘোষ।

শঙ্খদার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর ‘আদিম লতাগুল্মময়’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘দিনগুলি রাতগুলি’ পাঠ দিয়ে। এরপর কাব্যগ্রন্থ ‘নিহিত পাতালছায়া’, মূর্খ বড় সামাজিক নয়’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ কিংবা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের নামই ভিন্নমাত্রিক। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় শাসনের অসঙ্গতি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রভৃতি তাঁকে অন্য কবিদের চেয়ে ভিন্নতা দিয়েছে। নিজে সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও তিনি শুধু কবিতায় নয়, প্রয়োজনে রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।

তাঁর এই সব সামাজিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও তাঁর কবিসত্তা সবসময় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত পঞ্চাশ বছরে তাঁর কতো যে কবিতা পাঠ করেছি, হিসেব করে বলা মুশকিল। একই কাব্যগ্রন্থ বারবার পাঠ করেও অতৃপ্তি থেকেই গেছে। এত গভীর এবং নির্মাণকলার এমন আঁটোসাটো বাঁধুনি আমি অনেকের কবিতাতেই খুঁজে পাইনি, যা পেয়েছি শঙ্খ ঘোষের কবিতায়। আবার যখন তাঁর গদ্য পাঠ করেছি—‘ছন্দের বারান্দা’, ‘নিঃশব্দের তর্জনী’, ‘এই শহরের রাখাল’ কিংবা ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক’, ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’, ‘এ আমির আবরণ’ প্রভৃতি গ্রন্থে এক নতুন শঙ্খ ঘোষের ঘনসংবদ্ধ ও ঋজু গদ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণের যে তীক্ষ্ণ-ধী, তা আমাকে চমকে দিয়েছে বারবার। 

২.
শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ছায়ানটের আমন্ত্রণে ঢাকায় এলে ধানমণ্ডির যে বাসায় তিনি উঠেছিলেন, সেখানে। সম্ভবত আশির দশকে। আমি ও কবি অঞ্জনা সাহা আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। সামনে থেকে তাঁকে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। সাদা পাঞ্জাবি ও সাদা ধুতি পরিহিত একজন সাদাসিধে মানুষ বলেই মনে হয়েছে তাঁকে আমার। এত আস্তে ও সংযত হয়ে কথা বলেন যে, বিস্ময় লাগে, এই মানুষটিই যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, তখন এক অগ্নিগর্ভ জ্বালামুখ থেকে যেন লাভার উদ্গিরণ হচ্ছে বলে মনে হয়। যখনই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে, সে-পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে হোক কিংবা সল্ট লেকে তাঁর বাসায়, সেই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হৃদয়বান মানুষকে আমি একইরকম দেখেছি। বয়সের ভার তাঁকে ন্যুব্জ করতে পারেনি। যতবার ছুটির দিনে তাঁর বাসায় গেছি, ততবারই দেখেছি তরুণ ও প্রবীণ চেনা-অচেনা কবি-লেখক কিংবা সম্পাদকের ভিড়। কখনও বিরক্ত হতে দেখিনি।

কলকাতায় গেলে আমার সর্বাগ্রে যাঁর কথা মনে পড়ে, তিনি শঙ্খ ঘোষ। তীর্থ দর্শনের মতো শঙ্খদার বাসায় না গেলে মনে হয় আমার কলকাতা সফর বৃথা গেল। কয়েক বছর ধরেই তাঁর বাসায় আমি নিয়মিত যাই। সেই স্মিত হাসিমুখ, সেই আন্তরিকতা, অসুস্থ অবস্থায় হুইল চেয়ারে বসে থাকা সত্ত্বেও বৌদিরও আন্তরিক আপ্যায়ন বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ২০১৩ সালে আমি ও অঞ্জনা শঙ্খদার সল্ট লেকের বাসায় প্রথম যাই। অঞ্জনা তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র বই, যেটি সে শঙ্খ ঘোষকেই উৎসর্গ করেছে, সেটি তাঁর হাতে তুলে দেয়। শঙ্খদা কপালে ঠেকিয়ে তা গ্রহণ করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর তাঁর বাসায় আমাদের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। ২০১৪-১৫ সালেও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির মঞ্চে আমি বিশেষ অতিথি হিসেবে শঙ্খদার পাশে বসার সুযোগ পাই। ২০১৬ সালে বাসায় গিয়ে আমি আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কারপ্রাপ্ত আমার শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ম-বর্ণের শোভিত মুকুট’ তাঁর হাতে তুলে দিই। তিনি সুস্মিত হেসে হাতে তুলে নিয়ে বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখেন। আমরা অভিভূত হয়ে যাই!  এরপর তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে আমরা কলকাতায় ফের শঙ্খদার বাসায় যাই। তখন আমার অনুবাদকৃত বাংলা সাহিত্যের প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর ১৪ খণ্ডের কাব্যিক অনুবাদ বেরিয়েছে। বইটির প্রথম কপি শঙ্খদাকে উপহার দিতে পেরে আমি গৌরবান্বিত বোধ করি। ৪৪২ পৃষ্ঠার কাব্যিক অনুবাদ দেখে শঙ্খদা বিস্মিত হন। তিনি শুধু আস্তে বলেন, “অসাধারণ কাজ করেছো।” আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই।  ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমি সপরিবারে শঙ্খদার বাসায় যাই। সঙ্গে আমার ছেলে অর্ঘ্য সাহা, বৌমা নীপা সাহা, আমার একমাত্র নাতনি অদ্বিতীয় রাই সাহা এবং স্ত্রী কবি অঞ্জনা সাহাও ছিল। সঙ্গে ছিল বন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতা নূহ-উল-আলম লেনিন, কবি মাহাবুবা লাকি ও তার কন্যা রাবেয়া বসরী বুশরা। প্রত্যেকে এমন একজন মহান মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিল।

কিন্তু এখন সকলের দুঃখ একটাই, যদি ভাগ্যক্রমে করোনার কবল থেকে বেঁচে যাই এবং কলকাতায় বেড়াতে যাওয়াও হয়, কিন্তু শঙ্খদার সঙ্গে আর দেখা হবে না! শঙ্খদা শুধু বেঁচে থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে এবং তাঁর সৃষ্টিতে। বিদায়ের প্রণাম ও প্রণতি শঙ্খদা। চিরবিদায় আমার মানুষ-দেবতা!

লেখক পরিচিতি

অসীম সাহা
অসীম সাহার জন্ম ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে। আদি বাড়ি মানিকগঞ্জ শিবালয় থানার তেওতা গ্রামে। শৈশবের কয়েক বছর এখানেই কাটান। পরে পিতা অখিলবন্ধু সাহার কলেজের চাকরির সূত্রে ১৯৪৮ সালে মাদারীপুর চলে গেলে, সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। স্কলজীবন মাদারীপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়, এরপর ‘ইউনাটেড ইসলামিয়া হাই স্কুলে। ১৯৬৫-তে মাধ্যমিক পাশ করে মাদারীপুর নাজিমুদ্দিন মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭-তে উচ্চমাধ্যমিক, ১৯৬৯-এ স্নাতক পাশ করে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের পরীক্ষা দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে সম্পন্ন হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের পরীক্ষা ১৯৭৩ সালে শেষ হলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার লেখালেখির শুরু ১৯৬৪ সালে। ১৯৬৫ সালে ঢাকার পত্রিকায় ছোটদের জন্য লেখালেখির শুরু। সেই থেকে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, কিশোর কবিতা, গান প্রভৃতি রচনায় সিদ্ধহস্ত কবি অসীম সাহা এখনও অব্যাহতভাবে লিখে চলেছেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৫৬টি। পেয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১১), শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পুরস্কার (২০১২), কবিতালাপ পুরস্কার (২০১২), আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ) (২০১৩), বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ) (২০১৬), আইএফআইসি ব্যংক পুরস্কার (২০১৬) ‘একুশে পদক’ (২০১৯)-সহ আরও অনেক পুরস্কার।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত