কেবল তার দগ্ধ কাঠকে জানাই প্রণাম

ঙ্খ ঘোষ আমার কবি, বা আমাদের কবি ছিলেন না—‘আমরা যারা’ এই শতকের শুরুতে কবিতার হেমলক মাত্রই পান করতে শুরু করেছি। শঙ্খ ঘোষের বই কেনা তো দূরে থাক তার কবিতা কোথাও চোখ পড়লেও পড়তাম না। তিনি ছিলেন আমাদের শামসুর রাহমানের মতো ইস্যুমুখী কবি। তিনি খুব দরকারি কবিতা লিখতেন। যা ছিল আমার পাঠের বাইরে, বাবা-কাকা-মাস্টার মশাইদের জগতের মতো নীতিবিদ্যার। আর তখন ছন্দ তো দুচোখের বিষ। মাপা পথঘাট ভালো লাগে না।

এমন সময়ই শঙ্খ ঘোষের ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’—পুরনো, ছেঁড়া একটি বই পাই, কোনো এক বন্ধু ভীষণ রোদ্দুরে মাতাল হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ‘…হয়ত শিখবে’। তার নাম ত্রিবিন্দুর মধ্যে রাখলাম, যদিও সে প্রয়াত, কিন্তু তাকে কেউ শিখতে বলেছে এই চিহ্ন আমার কাছে আছে এটা সে কবরে শুয়েও হয়ত সহ্য করতে পারবে না! স্বাক্ষরটি শঙ্খ ঘোষের কিনা ঠিক মনে করতে পারছি। বইটি খুঁজে পেলে দেখতে পেতাম। কিন্তু এই লেখা লিখতে বসে সেটা মিহি কেরাণির কাজ। ধুলো নাড়বো না আমি।

সেই বই আমার অনেক বইয়ের চাপে বেঁচে ছিল দীর্ঘদিন। এরপর আজিজের দোতলায় লোকের সামনে ফ্লোরে বসে তাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হলো। হঠাৎই। দেখলাম সেই সময়ের কিছু ছবি অনেকে শেয়ার করছেন। আমার সঙ্গে তার ছবি থাকার কথা নয়, আমি ফোকাসের বাইরেই ছিলাম।

কী শান্ত, মন্ত্রোচ্চারণের মতো কথা বলছেন তিনি। আমাদের অগ্রজরা প্রচুর বললেও তিনি বলছিলেন খুবই কম, এতই কম যে শুধু এটুকু মনে আছে পাবনার স্মৃতি ও বরিশালের তাদের বাড়ির কথা। এই বাড়ির সন্ধানে কবি সেবন্তী ঘোষ, কবি শামীম রেজাসহ অনেকেই আমরা সুপুরি বাগানওয়ালা একটি পড়োবাড়ি, ছোট্ট একটি ঘাট বাঁধানো পুকুর, একটি জলসাঘরও কী ছিল—যার জানালার কাচ উচিয়ে রাখা সঙ্গীনের মতো। রঙিন। ছিল? হয়ত ছিল! এর পাশেই প্রয়াত এক সম্পাদকের দেয়ালঘেরা বাড়ি। স্থানীয় কেউ একজন বললেন, এর মধ্যে হিন্দুদের জমিও আছে। থাকবেই তো, থাকারই কথা। শঙ্খ ঘোষ তো উদ্বাস্তু, মাতৃভূমিহারা, তার চিতাকাঠ বরং বরিশালের নদীর পানিতেই ভাসিয়ে দেওয়া উচিত, মাতৃস্তন্য পান করুন তিনি মহাকাল ধরে।

তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি একটি পোড়াকাঠই বারবার দেখছি। অথচ তার গদ্য পড়লে, বিশেষত ‘জার্নাল’ এতটাই জীবন্ত যার শব্দ, বর্ণ, মনে হয় জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়। রবীন্দ্রনাথের আনন্দবাদী সত্তাটি তার মননে শক্তি ও সহায় হয়ে ছিল। যে কারণে কবিদের এত এত পতন—তিনি একা শুদ্ধ থেকে তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। হয়ে ‍উঠেছেন আস্থার প্রতীক।

লিখতে বসেছিলাম তার কবিতা নিয়ে, কিন্তু কোথায় চলে যাচ্ছি—হ্যাঁ, শঙ্খ ঘোষের সেই বই, বহু বইয়ের চাপে বেঁচে থাকা সেই দাঁড়ের শব্দটি একদিন আমি আবিষ্কার করলাম আমার হৃদয়ে। তখন আমি নত হয়ে এসেছি, নম্র হয়ে এসেছি, ছন্দের মাপা যদিও অসীম পথে হাঁটতে শুরু করেছি। তখন তিনিই ছিলেন জীবনদেবতা। তার কবিতা পড়ি বলা যাবে না, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি, স্পর্শ করি। আর ধীরে ধীরে বেঁচে থাকি। তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন। অগ্রজ যেভাবে অনুজের মধ্যে বেঁচে থাকেন, তেমনি তিনি বেঁচে আছেন আমার মধ্যে, আমার মতো হয়ত বহু পথহারা পথিকের সামনে।

তিনি বেঁচে আছেন।
কেবল তার দগ্ধ কাঠকে জানাই প্রণাম।

লেখক পরিচিতি

জাহিদ সোহাগ
জাহিদ সোহাগের জন্ম ১০ মার্চ ১৯৮৩, মাদারিপুর জেলা সদরের কুলপদ্বি গ্রামে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কবিতার বই : আর্তনাদও এক বায়বীয় ঘোড়া, অসুখের শিরোনাম, দুপুর, ব্যক্তিগত পরিখা, নামহীন, অহেতু বুদ্বুদ। কথাসাহিত্য : বড়দের মাছমাংস। যৌথ সম্পাদনা : তিন বাঙলার শূন্যের কবিতা।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর এ-কবিতাগুলি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ (বুয়েনোস আইরেসের জন্য ব্যাকুলতা)-এ অন্তর্ভুক্ত

অমৃতলোকের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

অনন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, একাত্তরের বাঙালির ভয়াল দিন-রাত্রিতে আপনি ছিলেন ঢাকা শহরের অধিবাসি হয়ে। দু’চোখে দেখেছেন জল্লাদ রক্তপিপাসু পাকিস্তানীদের রক্ত উল্লাস। উদ্যত রাইফেল আর মেশিনগানের মুখে গোটা বাংলাদেশ নেতিয়ে পড়েছিল

পেন পিন্টার প্রাইজ পেলেন জিম্বাবুয়ের ঔপন্যাসিক

তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ গত বছরের বুকার পুরস্কারের লং লিস্টে জায়গা করে নিয়েছিলো। দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত বছর গ্রেফতার হন তিনি।

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত