সংক্রান্তি ও প্রকৃতির চিহ্ন

ষড়ঋতুর বাংলাদেশ আজ কত ঋতুর দেশ এটি এক দীর্ঘ তর্কের তল। ষড়ঋতুর দেশ হিসেবে পরিচয় মুছতে থাকলেও এখনও এক এক ঋতু সাজে এক এক উৎসব আর মেলার আয়োজনে। অঞ্চল ও জাতিভেদেও ঋতুভিত্তিক আচাররীতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন। বারো মাসে তের পার্বণের বাংলাদেশে বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের কৃত্যআচারগুলি সকলক্ষেত্রেই উৎসমুখরতা তৈরি করে। পাশাপাশি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণকে ঘিরে দেশের নানানপ্রান্তে আয়োজিত হয় চৈত্রসংক্রান্তি, গাজন, চড়ক কি বৈশাখীমেলা। বাংলা বছরকে ঘিরে বাঙালি সমাজে চৈত্রসংক্রান্তি, হালখাতা, নববর্ষ যেমন বাংলার জনউৎসব তেমনি দেশের আদিবাসী সমাজে বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্যসমূহও জনউৎসবে রূপ নেয়। অঞ্চল ও জাতিভেদে বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবের নামগুলিও ভিন্ন ভিন্ন। সমতলের কোচ ও হাজং আদিবাসীরা বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবকে ‘বিহু’ বলেন। ভাওয়াল ও মধুপুরগড়ের বর্মণ ও কোচ আদিবাসীরা সন্যাসী পূজা, গাজন, চড়কপূজার মাধ্যমে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা এ উৎসবকে বলেন বিষু। সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের আদিবাসীদের অনেকেই এসময় পালন করেন দন্ডবর্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বর্ষবিদায় ও বরণের এ উৎসবকে বলেন বিজু। মারমারা বলেন সাংগ্রাই। রাখাইনদের ভাষায় সাংগ্রেং। ত্রিপুরারা বলেন বৈসু বা বৈসুক কোথাও বুইসুক। গুর্খা ও অহমিয়ারা বলেন বিহু। তঞ্চংগ্যারা বলেন বিষু। ম্রোরা এ উৎসবের নাম দিয়েছেন চানক্রান। চাক আদিবাসীরা এ উৎসবকে বলেন সাংগ্রাইং। খিয়াং আদিবাসীদের অনেকেই এ উৎসবকে সাংলান বলে থাকেন।

প্রতিটি ঋতু বেশ কিছু নির্দেশনা নিয়ে আসে। প্রকৃতির নির্দেশনা। ফুল-পাতা-ফল কী শস্য, পতঙ্গের বিস্তার, মাটির রঙ, পাখির ডাক, জলের তরঙ্গ সব কিছুতেই থাকে সেই নির্দেশনা। সমতল কী পাহাড়, অরণ্য কী গড়, বরেন্দ্র কী চর, উপকূল কী দ্বীপে এসব নির্দেশনা নানা ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। গ্রামীণ নিম্নবর্গ হাজার বছর ধরে প্রকৃতির এসব নির্দেশনা মান্য করেছে, করে তুলেছে জীবনের আরাধ্য। তৈরি করেছে কৃত্য, বিকশিত হয়েছে উৎসব। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের জনকৃত্যগুলিও প্রকৃতির নির্দেশনাকে পাঠ করেই বিকশিত। ফাল্গুনে ভাঁট, শাল, মহুয়া, মিষ্টিকুমড়া, বিলিম্বি, ভেন্না, আমরুল, নাগেশ্বর, পলাশ, কাঁঠালিচাপা, দোলনচাঁপা, কনকচাঁপা ফুটে। প্রকৃতি জানান দেয় বসন্ত ঋতু এসেছে। যদিও আজকাল বর্ষবিদায়ের চাইতেও ‘বর্ষবরণ’ হয়ে ওঠেছে এক প্রধান উৎসব। দেশের অপরাপর জাতিসমূহের কৃত্যমুখরতাকে ঢেকে তৈরি হয়েছে এক বাঙালি জাত্যাভিমান। তৈরি হয়েছে নানা কর্পোরেট উপনিবেশিক ব্যঞ্জনা। একতরফা কিছু চিহ্নের ভেতর দিয়ে ঢেকে ফেলা হচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক চিহ্নময়তা। বর্ষবরণ ওঠেছে কেবলি হালখাতা, পান্তা-ইলিশ, সাদা-লাল কাপড়ের এক বৈচিত্র্যবিমুখ শহুরে জমায়েত। ঋতুর প্রতি কৃতজ্ঞতা কী নতজানু প্রবৃত্তি হারিয়ে গেছে। প্রকৃতির চিহ্নের প্রতি দায় ও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠেছে এক নতুন প্রজন্ম। চলতি আলাপখানি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ ঘিরে প্রকৃতির সেইসব চিহ্নের প্রতি দরদ নিয়ে আগলে ওঠার আহবান জানায় বাংলাদেশকে।

তিতা শাক
প্রকৃতিতে তিতা জাতীয় শাকের উপস্থিতি জানান দেয় চৈত্র মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, বৈশাখ সমাগত। এটি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের সন্ধিস্থলের এক অনন্য চিহ্ন। তিতাশাক ছাড়া বাঙালি কী আদিবাসী সমাজে বর্ষবিদায় কৃত্য হয় না। গিমা তিতা, নাইল্যা, গিমা, দন্ডকলস, আমরুল, থানকুনি, নিম, নিশিন্দা, তেলাকুচা, মালঞ্চ, কানশিরা এ রকমের ১৩ থেকে ২৯ রকমের তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার চল আছে দেশের নানা জনপদে। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানান জাতের তিতাশাক খায়।

কাঁচা আম
গাছে গাছে গুটি আম বেশ পুষ্ট হয়ে ওঠে এ সময়। দেশের নানা প্রান্তে কাঁচা আম বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের কৃত্যে প্রথম গ্রহণ করা হয়। বাৎসরকি আম খাওয়ার অনুমতি নেয়া হয় প্রকৃতির কাছে। রবিদাসদের ভেতর হাজরা-কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে। বছরের প্রথম দিন ঘরের দেওকুড়ি নামের পবিত্রস্থলে কর্মের পূজা করা হয়। রবিদাসদের ভেতর যে যে কর্মপেশায় জড়িত তারা সেই কর্মের সাথে জড়িত আনুষঙ্গিক উপকরণগুলি দেওকুড়িতে রাখে। হাতুড়ি, কোদাল, শাবল, কাঁচি, ছুরি, বাটাল যার কর্মে যা লাগে সব। এ সময় ঢোল, খাজরি, ঝাল বাজানো হয়। রবিদাসদের ভেতর এসময় বাইশাখী পূজাও পালিত হয়।

শাল-মহুয়া
শাল-মহুয়াও প্রকৃতিতে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের চিহ্ন নিয়ে আসে। সাঁওতালি ভাষায় মাস বলতে বঙ্গা, চাঁন্দো শব্দ গুলির চল আছে। ফৗগুন (ফাল্গুন) মাস থেকেই শুরু হয় সাঁওতালি বর্ষ। বর্ষ বিদায় ও বরণের উৎসব বাহাও পালিত হয় এ মাসেই। এ সময় গাছে গাছে সারজম, ইচৗক, মুরুপ্ আর মহুয়া ফুল ফোটে। বাহা পরবের ভেতর দিয়েই সাঁওতাল সমাজ এসব ফুলের মধু পান ও ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রকৃতির কাছে। বাহার আগে এসব ফুলের ব্যবহার সামাজিকভাবে নিষেধ।

বিজু ফুল
বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ ঘিরে আয়োজিত বিজুই চাকমাদের সবচে বড় পরিসরের সামাজিক উৎসব । ফুল বিজু, মূল বিজু ও গয্যাপয্যা দিন এ তিন পর্বে বিভক্ত বিজুর শুরু হয় বাংলা চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ। পাহাড়-টিলা-বন ও গ্রাম ঘুড়ে ঘুড়ে এদিনে শিশু, কিশোর ও বালিকারা সংগ্রহ করেন নানান পদের ফুল। ভাতজরা ফুল বা বেইফুল ছাড়া বিজু জমে না। ভাতজরা ফুল বিজুর সময়ে ফুটে বলে অনেকে একে বিজুফুলও বলে।

আর্টওয়ার্ক: ধূলি

কাইনকো
কাইকনো বা নাগেশ্বর ফুলও দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর ভেতর বর্ষবিদায় ও বরণের প্রকৃতির চিহ্ন। বর্ষবরণের উৎসব সাংগ্রাইং এর প্রথমদিনকে বান্দরবানের চাক আদিবাসীরা বলেন পাইংছোয়েত বা ফুল দিন। চাকরা সাংগ্রাইংয়ের সময় কাইনকো বা নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহে মুখরিত হয়ে ওঠেন। পাইংছোয়েতর দিন গ্রামে গ্রামে আয়োজিত হয় পেকো (গিলা), গ্যাং (লাটিম), মাইকানিকছা (কানামাছি) নামের নানান চাক খেলা। সাংগ্রাইংয়ের দ্বিতীয় দিন হলো আক্যাই। এদিনে পাড়ার যুবসম্প্রদায় বাইক (ঢোল), লাংহোয়াক (ঝাঁঝ) ও হ্নে (বাঁশী) বাজিয়ে ক্যাং বা বৌদ্ধমন্দিরে যায় আর্শীবাদ গ্রহণের জন্য। সাংগ্রাইংয়ের শেষ দিনকে চাকরা বলেন আপ্যাইং।

চড়ক গাছ ও গাজনের দল
চৈত্র সংক্রন্তির এক অনবদ্য চিহ্ন হলো গ্রামাঞ্চলে গুড়ে বেড়ানো গাজন বা চড়কের দল। লাল সালু কাপড় পরিধান করে এবং শিব-গৌরি সেজে, কেউবা মুখোশ চাপিয়ে মাগন সংগ্রহ করেন। পামাপাশি দেশের নানাপ্রান্তে নানা আয়োজনে চড়ক পূজার চড়ক গাছ এবং নীল কাঠও এক অনন্য চিহ্ন।

গ্রামীণ মেলা
চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে গ্রাম জনপদের আদি মেলা গুলোও এক ধরণের জনচিহ্ন। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণকে ঘিরে মূলত: চৈত্রসংক্রান্তিতেই গ্রামজনপদে মেলা আয়োজনের আদি চল। গাজীপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের নানাপ্রান্তে যেখানেই চড়কপূজা আয়োজিত হয় সেখানেই এখনও মেলার আয়োজন ঘটে। বিশেষত: চাবাগান এলাকাগুলোতে এসব মেলার আয়োজন স্থানিক এবং স্বত;স্ফ’র্ত। এসব মেলা কোনো কোনোটি একদিন স্থায়ী হয়, কোনোটি চলে দিনকয়েক, কোনোটিবা পনের দিন কি একমাস। তবে চলতি সময়ে বর্ষবিদায় ও বরণ ঘিরে আয়োজিত মেলা গুলোর স্থায়িত্ব খুব কম এলাকায় এক মাস গড়ায়। অঞ্চলভেদে এসব মেলায় আগে ভিন্ন ভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রি, ফলফলাদি, বীজ, পঞ্জিকা পাওয়া গেলেও এখন দেশের প্রায় সব এলাকার মেলাই একাকার হয়ে গেছে। এ যেনর বহুজাতিক বিশ্বায়িত দুনিয়ার বাণিজ্য বাহাদুরি।

আমরা ক্রমান্বয়ে প্রকৃতির এসব চিহ্ন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ঋতুর অদলবদল এবং ঐতিহাসিক ব্যাকরণ ধরতে পারছি না। তৈরি হচ্ছে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের এক অপরিচিত নয়া ভাষিক তল এবং নানা অধিপতি চিহ্নের বাহাদুরি। দেশের নি¤œবর্গের হাজার বছরের চিহ্নের উপর এ এক প্রশ্নহীন উপনিবেশিক আঘাত। প্রকৃতির নির্দেশনা ও চিহ্নের প্রতি নতজানু হওয়া ছাড়া কোনোভাবেই বর্ষবিদায় ও বরণের কোনো মৌলিক বিকাশ সম্ভব নয়। এই প্রবণতা পণ্যমুখী এক কর্পোরেট বাজারের দিকেই মানুষকে চেপে ধরে আর বেসামাল করে তুলে। নতুন বছরে দেশের সকল প্রান্তে টিকে থাকা ও লড়াই করে যাওয়া প্রকৃতির সকল চিহ্ন সুরক্ষায় আহবান আবারো সকলের প্রতি। আসুন নতজানু হই, আগলে বাঁচি সকল আড়াল ছিন্ন করে।

লেখক পরিচিতি

পাভেল পার্থ
লেখক ও গবেষক।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরও পড়ুন

সিয়াম-শাহতাজের জমাটবদ্ধ লাল পদ্ম

ঈদের ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আরটিভির পর্দায় মুক্তি পাবে ফিকশনটি ।

অভিনেতা খায়রুল বাসারের একান্ত সাক্ষাৎকারঃ ১ম পর্ব

নবাগত অভিনেতা খায়রুল বাসার ইতিমধ্যেই বড় এবং ছোট পর্দার নানান চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও টিভি ফিকশনে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক এবং সমালোচক উভয় মহল থেকেই প্রশংসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেএমবির শিল্প বিভাগের সম্পাদক ও নির্মাতা সিজু খান। যার প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদকঃ ইমরানুজ্জামান সোহাগ

Get in Touch

সর্বশেষ প্রকাশিত